সউদী আরবের বিমানবন্দরে হামলায় বাংলাদেশিসহ নিহত ১২, আহত ৩ শতাধিক

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় সউদী আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশিসহ অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩০৯ জন। হামলার পর বিমানবন্দরটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

রবিবার (১১ অক্টোবর) ভোরে সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (জিএসিএ) এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটি জানায়, শনিবার রাতে চালানো হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সৌদি আরবের চারজন নাগরিক, বাংলাদেশের দুজন, যুক্তরাষ্ট্রের একজন, মিসরের একজন, জর্ডানের একজন, সিরিয়ার একজন, ফিলিস্তিনের একজন এবং সুদানের একজন রয়েছেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের সবাইকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হামলায় বিভিন্ন স্থাপনারও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে। এর আগে এক বিবৃতিতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। কর্মকর্তারা ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা করছেন এবং আহতের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণের চেষ্টা করছেন।

এদিকে, ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট যাত্রী টার্মিনালে হামলার জন্য হুতিদের দায়ী করেছে। এ ঘটনাকে ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাপরাধ’ বলে অভিহিত করেছে জোটটি। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি বলেছেন, ‘প্রচলিত আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী এই সন্ত্রাসী হামলার জবাব দৃঢ়ভাবে দেওয়া হবে।’

আল-মালিকি জানিয়েছেন, সৌদি আরবের দাম্মামে কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেও পৃথক একটি ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশে একটি প্রক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়েছে।’

সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলার নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, সৌদি আরবে হুতিদের হামলার, বিশেষ করে শনিবার কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার, তীব্র নিন্দা জানায় ওয়াশিংটন। তবে হুতিরা এখনো সর্বশেষ হামলার দায় স্বীকার করেনি।

শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে রুবিও বলেন, ‘এই নিন্দনীয় হামলাগুলো নিরীহ বেসামরিক মানুষের জীবনের প্রতি চরম অবজ্ঞার প্রমাণ। এগুলো এখনই বন্ধ করতে হবে।’ এর আগে বৃহস্পতিবার কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় অন্তত তিনজন সৌদি নাগরিক নিহত হন। তাদের মধ্যে একজন পাইলট ছিলেন বলে জানিয়েছে সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরব এবং দেশটির সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনের এডেনভিত্তিক সরকারের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। শনিবার ইয়েমেন থেকে আল জাজিরার সংবাদদাতা ইউসুফ মাওরি জানান, সর্বশেষ হামলার দায় এখনো স্বীকার করেনি হুতিরা। তবে ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠী বিমান চলাচলকারী সংস্থাগুলোকে সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার না করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনার ওপর দিয়ে চলাচল ছাড়া সৌদি আকাশসীমায় পরিচালিত যেকোনো উড়োজাহাজ তাদের লক্ষ্যবস্তু হবে।

শনিবার দিনের শুরুতে আকাশপথে চলাচলে বিঘ্ন ঘটার খবরের মধ্যে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের সরাসরি নিজ নিজ বিমান সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে ফ্লাইটের অবস্থা যাচাই করতে বলেছিল। তবে প্রাথমিক নির্দেশনায় বিমানবন্দরের কার্যক্রমে বিঘ্নের কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

হামলার পর সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও দেশটিতে ভ্রমণরত সৌদি নাগরিকদের ভ্রমণসূচিতে বিঘ্ন ঘটলে স্থানীয় দূতাবাসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করার নির্দেশ দিয়েছে। সর্বশেষ হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকেরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি হামলায় যুক্তরাষ্ট্র যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে কি না।

জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যোগ দিতেও পারি। বিষয়টি আমরা বিবেচনা করব। আমরা এইমাত্র সর্বশেষ হামলার খবর পেয়েছি। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নেব। আমরা খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিই।’ এদিকে, রিয়াদে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাস সৌদি আরবে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের জন্য সতর্কবার্তা জারি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মিশন জানিয়েছে, তারা রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার বিষয়ে অবগত রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটিতে অবস্থানরত সব মার্কিন নাগরিককে বিমানবন্দর ও এর আশপাশের এলাকা এড়িয়ে চলার জন্য জোরালোভাবে পরামর্শ দিয়েছে। যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের দূতাবাস তাদের নাগরিকদের বিমানবন্দরে একটি ‘গুরুতর ঘটনা’ ঘটার বিষয়ে সতর্ক করেছে। কানাডার দূতাবাস রিয়াদে অবস্থানরত নাগরিকদের বিমানবন্দরে সব ধরনের যাতায়াত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। সেখানে ‘চলমান সামরিক তৎপরতা’ থাকার কথাও উল্লেখ করেছে দূতাবাসটি।

শনিবারের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে হামলাটিকে ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে দেশটি। জর্ডান ও ওমানও রিয়াদের প্রতি সমবেদনা ও সংহতি জানিয়েছে। সৌদি আরবের বিমানবন্দরসহ বেসামরিক স্থাপনায় হুতিদের হামলার ‘তীব্র’ নিন্দা জানিয়েছে জাপানের দূতাবাসও।

বিমানবন্দর বন্ধ থাকার কারণে ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে কুয়েত এয়ারওয়েজ। ‘নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির’ কারণে বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

এর আগে বৃহস্পতিবার হুতিদের সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, তাদের গোষ্ঠী রিয়াদের বিমানবন্দর লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে বলে দাবি করেন তিনি। তার দাবি অনুযায়ী, এতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং আকাশপথে বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এর কয়েক দিন আগে আবহা ও কিং খালেদ বিমানবন্দরে হুতিদের চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠা হামলায় তিনজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত এবং ৩৬ জন আহত হন। তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

 আরো পড়তে পারেন:  

Loading...