
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের ব্যয় মেটাতে সরকার অক্টোবর মাসে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সরকার নিট ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটাতে চলতি অক্টোবর মাসে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে চলতি অর্থবছরের মধ্যে অক্টোবর মাসেই সর্বোচ্চ পরিমাণ ঋণ নেওয়া হচ্ছে। মূলত বাজেট ঘাটতি পূরণ এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়াসহ নতুন পে স্কেলের বেতন পরিশোধের জন্য এই বিশাল অংকের অর্থের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আয়ের গতি আশানুরূপ না হওয়া এবং বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ থাকায় সরকারকে ব্যাংক থেকে বাড়তি ঋণ নিতে হচ্ছে। তবে ব্যাংক খাতে বর্তমানে পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত তারল্য থাকায় এই ঋণের কারণে সুদের হারে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বন্ডের নিলামের মাধ্যমে সরকার ৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে ৯ দশমিক ১২ শতাংশ সুদে তিন বছর মেয়াদি ৮০০ কোটি টাকা এবং ৮ দশমিক ২০ শতাংশ সুদে দুই বছর মেয়াদি ৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে। এর আগে গত রোববার বিভিন্ন ধরনের ট্রেজারি বিলের বিপরীতে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। নিলামের এই ধারাবাহিকতা অনুযায়ী, চলতি মাসে বিলের বিপরীতে আরও ৩৫ হাজার কোটি টাকা এবং বন্ডের বিপরীতে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
নিলামের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা যায়, সাধারণত প্রতি রোববার বিল এবং মঙ্গলবার বন্ডের নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। তবে আগামী মঙ্গলবার সরকারি ছুটির কারণে নিলামের সময়সূচিতে পরিবর্তন এনে সোমবার তা সম্পন্ন করা হবে, যার মাধ্যমে ৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। সরকারের এই ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়াটি একটি নিয়মিত অর্থনৈতিক কার্যক্রমের অংশ। বাজেট ঘাটতি মেটানোর পাশাপাশি আগের নেওয়া ঋণের দায় পরিশোধের জন্যও সরকারকে ব্যাংক থেকে নিয়মিত অর্থ সংগ্রহ করতে হয়।
চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার নিট ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। আগস্ট মাস শেষে ব্যাংক খাতে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের চেয়ে পরিশোধের পরিমাণ বেশি ছিল, যার ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সরকারের ঋণের স্থিতি ৯০ হাজার ৩২৩ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। গত অর্থবছরে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সরকার শেষ পর্যন্ত ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। এদিকে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ধীরগতির কারণে জুলাই মাসে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে নেমে এসেছে। বিনিয়োগে কাঙ্ক্ষিত সাড়া না মেলায় ব্যাংকগুলোর হাতে এখন প্রচুর উদ্বৃত্ত তারল্য জমা হয়েছে, যা সরকারি ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
আগামী দিনগুলোতেও সরকারের ঋণ নেওয়ার এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে সরকার বিল ও বন্ডের বিপরীতে ৫৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং ডিসেম্বর মাসে ৩৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এর আগে জুলাই মাসে ৫৬ হাজার কোটি, আগস্টে ৫০ হাজার কোটি এবং সেপ্টেম্বরের নিলামে ৪১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল সরকার।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি ঋণের এই চাপ সামলাতে ব্যাংক খাতের তারল্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বর্তমানে উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে, তবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়। কম সুদের প্রণোদনা প্যাকেজ থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়ছে না। সার্বিক পরিস্থিতিতে বাজেট ঘাটতি মেটানো এবং সরকারি ব্যয় নির্বাহের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ।




























