১০ নম্বর জার্সিতে বিশ্বফুটবল মাতিয়েছেন যারা

ফুটবল কিংবদন্তি দিয়াগো ম্যারাডোনার মৃত্যুর নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘জার্সি নম্বর ১০’। ম্যারাডোনার ছেলে জুনিয়র দিয়াগো বলেছেন, লিওনেল মেসির এখনই আর্জেন্টিনা এবং বার্সেলোনায় তাঁর ১০ নম্বর জার্সি ছেড়ে দেওয়া উচিত। প্রয়াত ম্যারাডোনার প্রতি সম্মান দেখানোর এটাই সেরা উপায়, মত জুনিয়র দিয়াগোর। আর্জেন্টিনা এবং বার্সেলোনা, দুই দলেই ১০ নম্বর জার্সিতে খেলেছেন ম্যারাডোনা। বিশ্ব ফুটবলের সেরা ১০ নম্বরদের দেখে নেওয়া যাক।

পেলে: সর্বকালের অন্যতম সেরা। কাকতালীয়ভাবেই ১০ নম্বর জার্সি ওঠে তাঁর গায়ে। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ১৭ বছরের পেলে জাতীয় দলে সুযোগ পান। সে বার ব্রাজিল সকার ফেডারেশন ফুটবলারদের জার্সি নম্বর আয়োজকদের দিতে ভুলে যায়। তড়িঘড়ি সবাইকে একটা করে নম্বর দেওয়া হয়। পেলে ঘটনাচক্রে ১০ নম্বর জার্সি পেয়ে যান। সেই বিশ্বকাপে ৬টি গোল করে তারকা হয়ে যান পেলে। অন্য কোনও জার্সি আর গায়ে তোলেননি তিনি।

দিয়াগো ম্যারাডোনা: নাপোলির সঙ্গে ম্যারাডোনার ১০ নম্বর জার্সি এতটাই সমার্থক ছিল যে তিনি খেলা ছাড়ার পর ১০ নম্বর জার্সি চিরতরে তুলে রেখে দেয় ইতালির এই ক্লাব। সেই জার্সি আবার বের হয় ম্যারাডোনা প্রয়াত হওয়ার পরে। নাপোলির গোটা দল ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামে। সেরা ১০ নম্বর কে, তা নিয়ে পেলের সঙ্গে লড়াই শুধু তাঁরই। এই জার্সিতেই আছে মিথ হয়ে যাওয়া ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোল এবং সেই ম্যাচেই কিছু ক্ষণ পরে সেই অবিস্মরণীয় গোল।

লিওনেল মেসি: ৫টি ব্যালন ডি’অরের মালিক। ৬ বার ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতা। আধুনিক দিয়েগো ম্যারাডোনা তিনিই। বার্সেলোনার হয়ে ১০ নম্বর জার্সিতে ৪৯৪ ম্যাচে ৪৪৮টি গোল করেছেন। ২০১২ সালে এক ক্যালেন্ডার বছরে রেকর্ড ৯১টি গোল করেন। এই ১০ নম্বর জার্সিধারীর জন্য বার্সেলোনা তাদের ইতিহাসে সাম্প্রতিক সময়ে অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে। বার্সাকে ১০টি স্প্যানিশ লিগ, ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ৬টি কোপা দেল রে, ৮টি সুপার কোপা, ৩টি উয়েফা সুপার কাপ, ৩টি ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ দিয়েছেন মেসি।

জোহান ক্রুয়েফ: লিওনেল মেসিরা বার্সেলোনায় এখন যে ঘরানার ফুটবল খেলেন, তার জনক জোহান ক্রুয়েফ। আর এই ‘টোটাল ফুটবল’-এর জন্ম সাতের দশকের হল্যান্ড দলের হাত ধরে। ক্রুয়েফ না থাকলে রেনাস মিশেলের ‘টোটাল ফুটবল’ দেখতেই পেত না ফুটবল বিশ্ব। ‘ফ্লাইং ডাচম্যান’-এর দেখানো পথেই পরবর্তীতে নেদারল্যান্ডস ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন রুড খুলিট, মার্কো ভ্যান বাস্তেন, ফ্রাঙ্ক রাইকার্ডরা।

মিশেল প্লাতিনি: ক্লাব ফুটবলে ৪৩২ ম্যাচে ২২৪ গোল। ফ্রান্সের হয়ে ৭২ ম্যাচে ৪১ গোল। এই দুটো পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে কেন মিশেল প্লাতিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা ১০ নম্বর। তিন বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী প্লাতিনি অবশ্য ফ্রান্সকে এক বারও বিশ্বকাপ এনে দিতে পারেননি, যেটা জিদান পেরেছেন।

আরো পড়তে পারেন:  ৪ মার্চ: ইতিহাসে আজকের এই দিনে

রোনালদিনহো: ২০০৪ এবং ২০০৫ সালে ফিফার বর্ষসেরার পুরস্কার পান। ২০০২ সালে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম কারিগর। বার্সেলোনার হয়ে তাঁর পারফরম্যান্স চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো। নিজে যে রকম বহু দর্শনীয় গোল করেছেন, তেমনই অনবদ্য কিছু গোল করিয়েছেন সতীর্থদের দিয়ে। বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা প্লে-মেকার এই ব্রাজিলীয়।

ইউসেবিও: ফুটবলবিশ্বের ‘দ্য ব্ল্যাক প্যান্থার’। শুধু তাঁর জন্যই পর্তুগাল ফুটবল দলকে স্টাইলিশ লাগত। পর্তুগাল দলে এই স্টাইল বা ফ্যাশন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোও আনতে পারেননি। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তাঁকে আটকাতে রীতিমতো গুণ্ডাগিরি করতে হয়েছিল ইংল্যান্ডকে। কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছেড়েছিলেন ইউসেবিও।

জিকো: মাঠে নামলে তাঁর পজিশন ঠিক কী, সেটাই গুলিয়ে যেত সবার। এ রকম অলরাউন্ডার ১০ নম্বরধারী ফুটবল ইতিহাসে আর আসেননি। এমনিতে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, দ্বিতীয় স্ট্রাইকার বা ইনসাইড ফরোয়ার্ড, এমনকি পুরোদস্তুর ফরোয়ার্ড হিসেবেও অনায়াসে রাজত্ব করেছেন। মূলত ডান পায়ের প্লেয়ার হলেও বাঁ পা-ও সমান সচল ছিল। ছিলেন সেটপিস বিশেষজ্ঞও।

আলেসান্দ্রো ডি স্টিফানো: পেলে, ইউসেবিওর মতে সবদিক থেকে সম্পূর্ণ ফুটবলারের নাম আলেসান্দ্রো ডি স্টিফানো। ৫২২ ম্যাচে ৩৭৬ গোল পেলে, ইউসেবিওকে সঠিক প্রমাণ করেছে। রিয়েল মাদ্রিদের অনেকেই বলেন, ডি স্টিফানোই তাদের ক্লাবের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলার।

জিনেদিন জিদান: ফুটবলে তাঁর স্টাইল এবং সূক্ষ্মতা কতটা, সেটা ২০০২ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে রিয়েল মাদ্রিদের হয়ে জয়সূচক গোলটা দেখলেই বোঝা যায়। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে তাঁর জোড়া গোলেই ব্রাজিলকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতে নেয় ফ্রান্স। তবে ৮ বছর পরে ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতালির মার্কো মাতেরাজ্জিকে মাথা দিয়ে গুঁতো মেরে লাল কার্ড দেখেন। সেটাই ছিল জাতীয় দলের হয়ে তাঁর শেষ বারের মতো ১০ নম্বর জার্সি গায়ে তোলা।

ফেরেঙ্ক পুসকাস: রিয়েল মাদ্রিদের সর্বকালের সেরা দলে ফেরেঙ্ক পুসকাস ছিলেন মূল স্তম্ভ। যে সময়ে ফুটবল খেলেছেন, তখন সে ভাবে ম্যাচ রেকর্ড করা হত না। তাই অনেকেই বলেন পুসকাসকে না দেখার আক্ষেপ মিটে যাবে মারাদোনা, প্লাতিনি, ক্রুয়েফদের খেলা দেখলে। হাঙ্গেরির সর্বকালের সেরা ফুটবলার তিনি।

রিভালদো: বলা হয়, ডান পা ছাড়া রিভাল্ডোর সব ছিল। অসাধারণ ড্রিবলার। গোলের মুখে বাঁক খাওয়া ফ্রি-কিক মানেই এই ব্রাজিলীয় তারকা। দূর থেকে গোল করার বিস্ময়কর ক্ষমতা ছিল। বাইসাইকেল কিকে বেশ কিছু অনবদ্য গোল আছে তাঁর।

আরো পড়তে পারেন:  পবিত্র শবে কদরের ফজিলত ও আমল

ডেনিস ল: ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে তিনি ‘দ্য ল ম্যান’। ম্যাট বুসবি একাধিক বার বলেছেন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে তিনি যাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ডেনিস ল সেরা। ভুলে গেলে চলবে না বুশবির ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন জর্জ বেস্ট, ববি চার্লটনরা।

রবার্তো বাজ্জিও: দুটো উইংয়ে যে রকম সচল ছিলেন, সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবেও ততটাই সপ্রতিভ। তবে ইটালির এই ফুটবলারের সবথেকে প্রিয় জায়গা ছিল ফরোয়ার্ডের ঠিক পিছনে। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে পেনাল্টি মিস করা ছাড়া মাঠে নেমে আর কোনও ভুল করেছেন বলে মনে হয় না।

লোথার ম্যাথাউস: যখন খেলা শুরু করেছিলেন, তখনও ববি মুর, জর্জ বেস্ট, জোহান ক্রুয়েফরা খেলছেন। আর যখন খেলা ছেড়েছেন, তখন লুই ফিগো, থিয়েরি অঁরি, জিনেদিন জিদানদের পাশে একই রকম উজ্জ্বল। অসাধারণ প্রতিভা না থাকলে একটা শতাব্দীর প্রায় এক চতুর্থাংশ দাপট দেখিয়ে খেলা যায় না। নিঃসন্দেহে জার্মানির সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার।

মাইকেল লড্রুপ: শুধু ডেনমার্কের ফুটবলেই নয়, সে দেশে যে সব ভাল জিনিস হয়েছে, তার মধ্যে মাইকেল ও ব্রায়ান লড্রুপ এবং পিটার সিমিচেলকে ধরা হয়। হাতে গোনা যে কয়েক জন রিয়েল মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনা দুই দলের হয়েই খেলেছেন, মাইকেল লড্রুপ তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

জর্জে হাজি: রিয়েল মাদ্রিদে দুই বছর যেভাবে চুটিয়ে রাজত্ব করেছিলেন, প্রশ্ন তোলা হয়, রোমানিয়ায় না জন্মে হাজি যদি ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বা ইটালিতে জন্মাতেন, তা হলে কী করতেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে উত্তর আয়ারল্যান্ডের কিংবদন্তি জর্জ বেস্টের মতোই ভাগ্য তাঁর। তিনিও মাইকেল লড্রুপের মতো রিয়েল মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনা দুই দলের হয়েই খেলেছেন।

ফ্রানসেসকো টোট্টি: ইতালিয়ান মিডিয়া কখনও তাঁকে বলেছে ‘দ্য গোল্ডেন বয়’, কখনও ‘দ্য এইটথ কিং অফ রোম’, ‘দ্য বিগ বেবি’, ‘দ্য ক্যাপ্টেন’, বা কখনও ‘দ্য গ্ল্যাডিয়েটর’। কেউ কেউ আবার পাওলো রোসির কথা মাথায় রেখেও বলেন, টোট্টিই ইতালির সর্বকালের সেরা ফুটবলার। নিজে গোল করার পাশাপাশি যে ভাবে একের পর এক গোল করিয়েছেন সতীর্থদের দিয়ে, তাতে অনেকেই বলেন, তাঁর মতো নিঃস্বার্থ সেন্টার ফরোয়ার্ড খুব কমই এসেছেন। বিশেষ করে, সংশ্লিষ্ট ফুটবলারের দিকে না তাকিয়ে গোলের সামনে তাঁর ব্যাক হিল পাস ফুটবল দুনিয়া চিরকাল মনে রাখবে।

ডেনিস বার্গক্যাম্প: বলা হয় ফুটবলের ভ্যান গঘ হলেন নেদারল্যান্ডস এবং আর্সেনালের কিংবদন্তি ফুটবলার ডেনিস বার্গক্যাম্প। টেকনিকের দিক থেকে তাঁর আগে বা পরে আর কোনও ফুটবলার এই জায়গায় পৌঁছতে পারেননি। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে তাঁর পারফরম্যান্স ভোলার নয়। আর্সেনালে বার্গক্যাম্প না থাকলে থিয়েরি অঁরি, ইয়ান রাইট হত না। সূত্র: বিডি প্রতিদিন

আরো পড়তে পারেন:  কথা রাখলো না ভারত

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

 আরো পড়তে পারেন:  

DSA should be abolished
/ জাতীয়, সব খবর
Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *