সারাদেশে রেলস্টেশন পরিচ্ছন্নতার নামে লুটপাট

 

রেলওয়ে খাতে বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও রেলস্টেশনগুলোর পরিবেশের কোনো উন্নতি হয়নি। প্রায় ছয় লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে রেলের মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছে। ১০ বছরে প্রায় ১৫ হাজার জনবল নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু রেলের স্টেশনগুলোর চেহারা বদলায়নি। বরং এগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নামে লাখ লাখ টাকা লুট করা হচ্ছে। ৪৬৬টি স্টেশনের মাত্র ২৭টি স্টেশন পরিষ্কার করছে রেলের লোক (সুইপার)। বাকি ৪৩৯টি স্টেশন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কাছে দেয়া হয়েছে।

অভিযোগ, রেল অথবা ঠিকাদারের লোক কেউই যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে না। নামমাত্র ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দায়সারা কাজ করা হচ্ছে। আর রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে চুক্তি অনুযায়ী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না করেই ঠিকাদাররা প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা তুলে নিচ্ছে।

এ বিষয়ে রেলপথ সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন জানান, স্টেশনগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না থাকা খুব দুঃখজনক। স্টেশন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে এ বছর আলাদা করে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, কেনাকাটা এবং ঠিকাদার নিয়োগে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হয়ে থাকলে তা কঠোরভাবে দেখা হবে। এ নিয়ে আমরা ইতিমধ্যে বৈঠক করেছি।

অনিয়মকারী কোনো কর্মকর্তা রক্ষা পাবে না। রেলস্টেশন মাস্টারকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। স্টেশন মাস্টারের সুপারিশ ছাড়া রেলওয়ের সুইপার অথবা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কাউকে টাকা দেয়া হবে না। স্টেশন অপরিষ্কার থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জানা গেছে, রেলে মোট ৪৬৬টি রেলওয়ে স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলে ২৩৮ এবং পূর্বাঞ্চলে ২২৮টি। এসব স্টেশনের মধ্যে ১৪৪টি স্টেশন রিমডেলিং করা হয়েছে। তবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে সব ক’টি স্টেশনের পরিবেশ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। পশ্চিমাঞ্চলে মাত্র ১০টি স্টেশন পরিচ্ছন্ন করছে রেলের সুইপাররা। বাকি ২২৮টি স্টেশন ঠিকাদারদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চল ভাগ করে বেসরকারি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো লোক দিয়ে নামমাত্র পরিচ্ছন্নতার কাজ করাচ্ছে।

রেলের লোক (সুইপার) কিংবা ঠিকাদারের লোক শুধু ব্লিচিং পাউডার দিয়ে কোনোমতে কাজ সারছে। বছরের পর বছর রেলে ভিম পাউডার ব্যবহার না করেও হাতে-কলমে তা কেনা দেখানো হচ্ছে। ঝাড়–, পাটসুতাসহ ১০ প্রকার জিনিস কেনায় ব্যাপক অনিয়ম করা হচ্ছে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের গুটিকয়েক স্টেশন নামমাত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টোরে ৪-৫ বছর ধরে ভিম পাউডার নেই। ব্লিচিং পাউডার থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। বছরে নামমাত্র কিছু ব্লিচিং পাউডার কেনা হয়। মাঠ পর্যায়ে থাকা শ্রমিকরা ব্লিচিং পাউডারের সঙ্গে সাদা আটা কিংবা ময়দা মিশিয়ে ছিটান- এমন অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগ, এ অঞ্চলের মাত্র ১০টি স্টেশন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে বছরে প্রায় ছয় কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম কর্মকর্তা এবং প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের যোগসাজশে স্টেশন পরিষ্কারের নামে লাখ লাখ টাকা লুট করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন স্টেশন মাস্টার জানান, রাজশাহী ও খুলনাসহ বড় বড় স্টেশন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয় না। শুধু রেলওয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এলে ব্লিচিং পাউডার ছিটানোসহ গুটিকয়েক কক্ষ ধোয়ামোছা করা হয়।

এ বিষয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এসএএম ইমতেয়াজ জানান, তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সঠিক নয়। বরং চরম লোকবল স্বল্পতায় তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। ৪০০ সুইপারের স্থলে ১৯৯ জন সুইপারের পদ শূন্য রয়েছে। এ অঞ্চলের ১০টি বড় বড় স্টেশন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। বহু বছর ধরে ভিম পাউডার ব্যবহার করা হয় না স্বীকার করে তিনি বলেন, ব্লিচিং পাউডার দিয়ে কাজ চলছে। এ কাজে গত বছর কত টাকা ব্যয় করা হয়েছে তা দেখে বলতে হবে। তবে আড়াই-তিন কোটি টাকার বেশি নয়। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাব আমি দেব। কিন্তু ১০টি স্টেশনের বাইরে যেসব স্টেশন রয়েছে। সেগুলোর বিষয়ে আমি কিছু জানি না।

আরো পড়তে পারেন:  র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষ এক হাজারেও নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ওই সব স্টেশন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে লাখ লাখ টাকা রেল থেকে দেয়া হচ্ছে। যত অভিযোগ আমাদের বেলায়, দুর্র্নীতির সঙ্গে আমি জড়িত নই।’ এ অঞ্চলের ১৮টি স্টেশনে কাজ করা ঠিকাদারদের প্রধান বাণিজ্যিক দফতর থেকে প্রতি মাসে টাকা দেয়া হয়। নয়ছয় কাজ করে প্রতি মাসে টাকা তুলে নিচ্ছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তার (সিসিএম) বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা এএমএম শাহনেওয়াজ বলেন, ‘স্টেশনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে আমার বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা-বানোয়াট। এ অঞ্চলে প্রায় ৩৫টি স্টেশনে ঠিকাদার কোম্পানি কাজ করছে। চুক্তি অনুযায়ী তারা প্রতি মাসে টাকা নিচ্ছে।

বাকি স্টেশনগুলো মাত্র একজন করে সুপাইপার দিয়ে চালানো হচ্ছে। তাহলে কি করে পরিষ্কার রাখা যাবে। এছাড়া অস্থায়ী ভিত্তিতে প্রায় ৬০ জন সুইপার রাখা হলেও তাদের ঠিকমতো বেতনও দেয়া হয় না।

তিনি বলেন, ‘কেনাকাটা আমি করি না, কেনাকাটা করে পাকশী বিভাগের ডিসি। এমনিতেই নেই, আবার দুর্নীতির অভিযোগ। এসির ভেতর বসে অনেক কিছুই বলা যায়, মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে এলে বোঝা যায়, কত কষ্ট।’ তিনি বলেন, কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই। লোক স্বল্পতার মধ্যে কাজ করার চেষ্টা করছি।

পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে মোট ২২৮টি স্টেশনের মধ্যে রেলওয়ের লোক (সুইপার) ১৭টি স্টেশন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করছে। এ অঞ্চলে আটটি ভাগে প্রায় ৫০টি স্টেশন ছয়টি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিষ্কার করা হচ্ছে। বাকি স্টেশনগুলো পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে প্রধান বাণিজ্যিক দফতর করাচ্ছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এ অঞ্চলের কমলাপুর, বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম ও সিলেট রেলওয়ে স্টেশনও যথাযথ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয়নি। কমলাপুর স্টেশনের প্লাটফর্মসহ স্টেশন এলাকা ময়লা আবর্জনায় ভরা। ঢাকা রেলওয়ে থানার সামনে মলমূত্র ভাসতেও দেখা গেছে। একই অবস্থা প্লাটফর্ম ঘেঁষা লাইনগুলোতেও।

ঝাড়ু ও পাটসুতা দিয়ে সুইপারদের স্টেশনগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন সুইপার জানান, কোনো আধুনিক সরঞ্জাম নেই। শুধু পাটসুতা ও ঝাড়ু দিয়ে কি পরিষ্কার হয়? ভিম পাউডার নেই, ব্লিচিং পাউডারই সম্বল। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না করায় স্টেশনগুলো ময়লা আবর্জনায় ভরে উঠছে। এতে দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে স্টেশনগুলোর পরিবেশ।

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম শাখার অফিস সুপারিন্টেনডেন্ট মিজানুর রহমান জানান, এ অঞ্চলে সুইপারের অভাব রয়েছে। ১৭টি স্টেশনে রেলের লোক কাজ করছে। বাকি স্টেশনগুলো ঠিকাদারের মাধ্যমে করা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রায় তিন বছর ধরে ভিম পাউডার নেই। আমরা ১৭টি পণ্য ক্রয় করি। এর মধ্যে ভিম অন্যতম। কিন্তু এ অন্যতম পণ্যটিই নেই। তিনি বলেন, প্রতি বছর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় কত টাকা খরচ হচ্ছে তার হিসাব নেই। তবে আমরা প্রায় এক কোটি টাকা চেয়েছিলাম এবার, বরাদ্দ পাওয়া গেছে মাত্র দুই লাখ টাকা।

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (সিসিএম) এসএম মুরাদ হোসেন  জানান, সম্প্রতি এ নিয়ে রেলভবনে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। স্টেশন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রাখার জন্য সর্বোচ্চ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে আমাদের লোকবলের অভাব রয়েছে। যা আছে তা দিয়েই কাজ চালানো হচ্ছে। সাধারণ যাত্রীদেরও সচেতন হওয়া উচিত জানিয়ে তিনি বলেন, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি মাসেই টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে।

মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন হচ্ছে স্টেশনগুলো। যেসব স্টেশন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে না সেসব স্টেশনের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।তিনি বলেন, কেনাকাটায় তিনি সম্পৃক্ত নন। ফলে অনিয়ম কিংবা দুর্নীতি হয়েছে কিনা তা তিনি জানেন না। তবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে তদন্ত করা হবে।

সূত্র: যুগান্তর

দেশের আরো প্রতি মূর্হর্তের খবর জানুন এখানে

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

আরো পড়তে পারেন:  ভারত-পাকিস্তান সংঘাত: পরমাণু অস্ত্রে কার সক্ষমতা কেমন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *