সংসদে যোগদান বিএনপির রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা-মিত্র দল-বিশ্লেষকদের অভিমত

 

বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণকে হঠকারী সিদ্ধান্ত বলে মনে করছে তাঁর একাধিক রাজনৈতিক মিত্র দল। তাদের মতে, এই শপথগ্রহণ জাতির সঙ্গে এক ধরনের তামাশা আর ২০ দলীয় জোটের নির্যাতিত নেতাকর্মীদের ‘মুখে লাথি’ দেওয়ার সমান। এই শপথের ঘটনা ২০ দলীয় জোটের ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এত দিন সংসদকে অবৈধ বলে নিজেরাই সেই সংসদে যোগ দেওয়া রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা। এর মধ্য দিয়ে বিএনপি জোটের রাজনৈতিক পরাজয় হলো। বিএনপির নির্বাচিতদের মধ্যে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া আর সবার যোগ দেওয়ার ঘটনাকে ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের একাধিক শরিক দলের নেতা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কালের কণ্ঠ’র কাছে এভাবেই মূল্যায়ন করেছেন।

যে ব্যানার থেকে তাঁরা নির্বাচনে অংশ নিয়ে এমপি হয়েছেন, সেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সিনিয়র কোনো নেতার সঙ্গে শপথের বিষয়ে আলোচনা করেনি বিএনপির হাইকমান্ড। ফলে নাখোশ ড. কামাল হোসেনসহ অধিকাংশ নেতা। বিএনপি এককভাবে কেন এই সিদ্ধান্ত নিল সে বিষয়ে তাদের কাছে জবাব চাইবেন ফ্রন্ট নেতারা। পরিস্থিতি বিবেচনায় গতকাল মঙ্গলবার শাহবাগে ঐক্যফ্রন্টের পূর্বঘোষিত গণজমায়েতের কর্মসূচি স্থগিত করা হয়।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. অলি আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে এখন এরশাদের কোনো পার্থক্য নাই। যখন যা ইচ্ছা করছে। নিজেদের সুবিধার জন্য হারামকেও হালাল করা তাদের কাছে জায়েজ।’

এ ঘটনায় ২০ দলীয় জোটের ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কি না প্রশ্নের জবাবে সাবেক বিএনপি নেতা ও মন্ত্রী অলি আহমদ বলেন, ‘এই ঘটনায় ২০ দলীয় জোটের অনেকে বিক্ষুব্ধ। ৩০ ডিসেম্বরের তথাকথিত নির্বাচনের পরপরই বিএনপির পক্ষ থেকে ওই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। দিনের পরিবর্তে যেহেতু রাতের বেলায় ভোটের ব্যবস্থা চালু হয়েছে, সুতরাং আমরা এই নির্বাচনকে কোনোভাবেই সমর্থন করতে পারি না। কথা ছিল ২০ দলীয় জোটের যে বা যারা সংসদে শপথ গ্রহণ করবে, তারা জাতীয় বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত হবে।’

ড. অলি বলেন, ‘বিএনপি পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিল। আমরাও তা সমর্থন করেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে রাতের অন্ধকারে কী ঘটে গেল! নির্বাচনের সময়ে ২০ দলীয় জোটের ৩০-৩৫ হাজার নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে। এখনো অনেকের জামিন হয়নি। ২০ দলীয় জোটের কয়েক লাখ নেতাকর্মী মিথ্যা মামলা, হামলা, নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এই শপথ তাদের মুখে লাত্থি মারার সমান।’ 

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি কেন এই সিদ্ধান্ত নিল তা অবশ্যই আমরা তাদের কাছে জানতে চাইব। আমরা তাদের বলেছি, যেহেতু আমরা একসঙ্গে নির্বাচন করেছি, সংসদে যদি যেতেই হয়, হবে একসঙ্গে আলোচনা করে আন্দোলনের অংশ হিসেবে যাব। কিন্তু তারা সেটি না করে কেন গেল ফ্রন্টের কাছে তা পরিষ্কার করা উচিত।’

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অবৈধ সরকার ও তাদের অন্যায়কে মোকাবেলার জন্য এত দিন ধরে ক্রমাগত একটি দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেছেন বিএনপির নেতারা। সেখান থেকে কেন হুট করে এমন পরিবর্তন হলো তা বোঝা যাচ্ছে না। শপথ নেওয়ার কারণে বিএনপির একজন সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করা হলো। আবার দুই দিন পরই চারজন সংসদ সদস্য শপথ নিলেন। বিষয়টি তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়।’

মান্না গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনায় বলেন, ‘আমাদের লড়াই ছাড়া ভিন্ন কোনো পথ নেই। আপসকামিতায়-সহযোগিতা-সহমর্মিতায়-সমঝোতায় আপনি জিততে পারবেন না। যদি সমঝোতা (বিএনপির সঙ্গে সরকারের) হয় তাহলে সেই সমঝোতাটা খোলাখুলি বলেন কী সমঝোতা হয়েছে? খেলতে বসে দাবার চাল দিয়ে দিয়েছেন, এবার ওই পক্ষ চাল দেবে। আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে।’

জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক রতন বলেন, ‘আমরা জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন, আন্দোলন করছি। বিএনপির উচিত ছিল ফ্রন্টকে বিষয়টি জানানো। ফলে অনেক জটিলতা এড়ানো যেত।’

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপির স্থায়ী কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা সংসদে যাবে না। কিন্তু দেখা গেল তারেক রহমানের কথায় সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেন। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণ হলো দলটিতে গণতন্ত্রের চর্চা নেই। দলে গণতন্ত্র না থাকলে দেশে গণতন্ত্র থাকবে কিভাবে?’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি হয়তো চিন্তা করেছে সংসদে গিয়ে তাদের কথা তুলে ধরবে। কতটুকু কথা বলার সুযোগ পাবে সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ ব্যাপার। তবে সংসদে বিরোধীদের একটি কণ্ঠস্বর হওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।’

লেখক, বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আবুল মকসুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন কর্তৃক যারাই নির্বাচিত বলে ঘোষিত হন তাঁদের শপথ নেওয়াই স্বাভাবিক। সে হিসাবে বিএনপির যাঁরা শপথ নিয়েছেন তাঁরা সঠিক কাজই করেছেন। সরকারও সংসদে তাঁদের উপস্থিতি চাইছিল। তাঁরা সংসদে না গেলে যদিও সরকারের কোনো ক্ষতি হতো না কিন্তু বিব্রতকর হতো। কয়েক দিন দেরি করে বা দর-কষাকষিতে কী অর্জন করলেন তা তাঁরাই জানেন। তাঁরা কেউ শপথ না নিলে সরকারের এবং নির্বাচন কমিশনের রাজনৈতিক ও নৈতিক পরাজয় ঘটত। অন্যদিকে তাঁরা শপথ নেওয়ায় বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টের রাজনৈতিক পরাজয় হলো। এত দিন যা বলেছেন অবৈধ, এখন তাকেই বৈধতা দিলেন। এটাকে বলে রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা।’

বিএনপির কাছে জবাব চাইবে ঐক্যফ্রন্ট

জাতীয় ঐকফ্রন্টের একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেছেন, শপথ নেওয়ার ইস্যুতে গণফোরাম থেকে ৭ মার্চ সুলতান মোহাম্মদ মনসুরকে বহিষ্কার করা হয়। ১৯ এপ্রিল শোকজ করা হয় গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য মুকাব্বির খানকে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ নেওয়ার কারণে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান জাহিদকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর কী এমন ঘটনা ঘটল যে বিএনপি ইউটার্ন করে দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে চারজন সদস্যকে একযোগে শপথ নেওয়ার অনুমতি দিল। ফ্রন্ট নেতারা বলছেন, সৌজন্যের জন্য হলেও এ নিয়ে একটি বৈঠক আয়োজনের দরকার ছিল। কিন্তু বিএনপি সেটি করেনি।

ঐক্যফ্রন্টের সূত্রগুলো বলছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতারাও বুঝে উঠতে পারছেন না বিএনপির পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে। তাই ফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির পরবর্তী বৈঠক না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো নেতাই পরিষ্কার কিছু বলতে পারছেন না।

বিএনপির সিদ্ধান্তের কারণে গত সোমবারই বৈঠক করেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমন্বয় কমিটির নেতারা। গণফোরামের কেন্দ্রীয় নেতা জগলুল হায়দার আফ্রিকের সভাপতিত্বে অস্থায়ী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বিএনপির সিদ্ধান্তের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার, এ টি এম গোলাম মাওলা চৌধুরী, মোশতাক আহমেদ, জাহাঙ্গীর আলম মিন্টু, লতিফুল বারী হামিম, আব্দুল্লাহ আল তারেক, আজমেরী বেগম ছন্দাসহ আরো কয়েকজন।

বৈঠকে থাকা এক নেতা কালের কণ্ঠকে জানান, বিএনপির ওই সিদ্ধান্তে ফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন নাখোশ হয়েছেন। তিনি গণফোরামের নেতাদের বলেন, ‘তারা যদি শপথই নেবে তাহলে কেন আমাদের নেতাদের বহিষ্কার করাল? তারা তো আমাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারত।’ ফ্রন্টের মিডিয়া কমিটির সমন্বয়ক জাহাঙ্গীর আলম মিন্টু কালের কণ্ঠকে জানান, চলতি সপ্তাহেই ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক ডাকতে পারেন ড. কামাল হোসেন।

সূত্র: কালেরকন্ঠ

দেশের আরো প্রতি মূর্হর্তের খবর জানুন এখানে

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *