যে সড়কে অন্তঃসত্ত্বার গর্ভপাত ঘটে!

হবিগঞ্জ-লাখাই-সরাইল-নাছিরনগর সড়কজুড়ে গর্ত

হবিগঞ্জ-লাখাই-সরাইল-নাছিরনগর সড়কটি প্রায় ২৫ কিলোমিটার রাস্তা ভেঙে ফেলে রাখা হয়েছে। বছর গড়িয়ে গেলেও কাজ বন্ধ রেখেছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। সড়কটির ব্রিজগুলোও ভেঙে ফেলে রেখেছে তারা।

কাজ করাতো দূরের কথা প্রকল্প এলাকার আশেপাশেও দেখা মেলে না প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের। ফলে ওই সড়কে চলাচল দুষ্কর হয়ে পড়েছে।

এ সড়কে একবার গেলে যে কোনো সুস্থ মানুষও কয়েকদিন অসুস্থ থাকেন। রোগী হলেতো উপায়ই নেই। অনেক অন্তঃসত্ত্বার গর্ভপাত পর্যন্ত ঘটেছে।

ধীরে ধীরে চলতে গিয়ে মাত্র এক ঘণ্টার রাস্তা যেতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। প্রতিদিনই বিকল হয় অসংখ্য যানবাহন। এতে সাধারণ মানুষের মাঝে দিন দিন শুধু ক্ষোভ বাড়ছেই।

এ সড়কে চলাচলকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক শাকিল মিয়া জানান, এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে তিনি চলাচল করছেন। রাস্তারটি ভাঙ্গা থাকার কারণে প্রতিদিন সিএনজিগুলোর যন্ত্রাংশের ক্ষতি হচ্ছে। যে টাকা রোজগার করেন তার সিংহভাগই গাড়ির মেরামতে ব্যয় করতে হচ্ছে।

বুল্লা বাজারের ব্যবসায়ী মনিরুল আলম জসিম জানান, ঠিকাদারদের কাজে অনিয়ম ও কাজ বন্ধ রাখার কারণে পথচারীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। শুধু দুর্ভোগ নয়, ব্যবসা বাণিজ্যও বন্ধ হতে চলেছে।

সমাজসেবক নুরুল আলম সোহেল জানান, যে ঠিকাদার কাজ পেয়েছেন তিনি সঠিকভাবে কাজ করছেন না। তিনি তার নির্ধারিত কাজ অন্য আরও কয়েকজন ঠিকাদারকে ভাগ করে দেয়ার চেষ্টা করছেন। রাস্তাটি দ্রুত সংস্কার করার দাবি জানিয়ে কাজের অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি।

লাখাই উপজেলার করাব ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল হাই কামাল জানান, ঠিকাদারদের মাঝে ভাগবাটোয়ারা নিয়ে এ কাজটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এ রাস্তা দিয়ে কেউ একবার লাখাই গেলে ডাক্তার না দেখিয়ে উপায় নেই। কোনো গুরুতর অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে চাইলে রাস্তায়ই নির্ঘাত মৃত্যু। হাসপাতালে নিতে অনেক অন্তঃসত্ত্বার গর্ভপাত পর্যন্ত ঘটেছে।

রাস্তার এ অবস্থার কারণে মানুষের ব্যবসা বাণিজ্য পর্যন্ত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, ঠিকাদারদের আল্টিমেটাম দেয়া হয়েছে। তারা যদি ৭ দিনের মধ্যে কাজ না ধরে তবে আমরা কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবো। তিনি প্রয়োজনে কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের দাবি জানান।

এ বিষয়ে হবিগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম জানান, দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করতে তারা বার বার সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে তাগিদ দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য ঠিকাদারদের আলাদাভাবে চিঠি দেয়া হয়েছে। তারা জানিয়েছেন দ্রুত কাজ সম্পন্ন করবেন।

তিনি বলেন, শুনেছি টাকার অভাবের কারণে ঠিকাদার কাজ করতে পারছে না। তাদেরকে কাজটি দ্রুত করার জন্য তাগিদ দেয়া হচ্ছে। কাজ দ্রুত সম্পন্ন না করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ বিষয়ে জানতে ঠিকাদার মোজাহেরের মোবাইলে বাবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

জানা গেছে, হবিগঞ্জ থেকে লাখাই ও সরাইল হয়ে নাছিরনগর পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার রাস্তাটি আঞ্চলিক মহাসড়কে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ সড়কটির কাজ সম্পন্ন হলে ঢাকার সঙ্গে হবিগঞ্জে দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার কমবে। এ লক্ষ্যে হবিগঞ্জ সদর আসনের এমপি অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির বেশ কয়েক বছর আগে সড়কটির সংস্কারের উদ্যোগ নেন। তার চেষ্টায় উক্ত সড়কের বলভদ্র নদীর ওপর সেতুটিও নির্মাণ করা হয়।

২০১৭ সালের শেষের দিকে সড়কটি নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। সে অনুযায়ী কার্যাদেশ দেয়া হয়। কাজ শুরুও করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তারা শুধু ভেঙে ফেলে রেখেছে। পুরো রাস্তাটি ভেঙ্গে খানাখন্দে ভরে রয়েছে। একেবারেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অনেক স্থানেই বড় বড় গর্তও রয়েছে। এমনকি ব্রিজগুলো পর্যন্ত ভেঙ্গে ফেলে রাখা হয়েছে।

এ সড়কে সিএনজি অটোরিকশা, মিনিবাসসহ বিভিন্ন পরিবহন যখন গর্তগুলো অতিক্রম করে তখন যাত্রীরা মারাত্মক ঝাঁকুনি খেয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হন। ইতিমধ্যে অনেকের মাথা ফেঁটেছে। আবার রাস্তা দিয়ে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের শহরে নিয়ে আসার পথে গর্ভপাতের ঘটনাও ঘটেছে। এ অবস্থায় এলাকাবাসী ইতিমধ্যে রাস্তাটি সংস্কারের দাবিতে মানববন্ধন পর্যন্ত করেছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, হবিগঞ্জ থেকে লাখাই হয়ে নাছিরনগর পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার রাস্তাটি সংস্কার ও প্রশস্তকরণের লক্ষ্যে ২০১৭ সালের শেষের দিকে একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। ওই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা।

একই বছর দরপত্রের মাধ্যমে ১১০ কোটি ২৭ লাখ টাকায় মোজাহার এন্টারপ্রাইজ, তাহের ব্রাদার্স লিঃ, মাহফুজ খান (জেবি) নামে ৩টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজটি পায়। এর মাঝে রাস্তার কাজের জন্য ৭৬ কোটি ২৭ লাখ এবং ওই সড়কের ৫টি ব্রিজের নির্মাণ বাবদ ৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।

তারা ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাস্তা ভাঙ্গার কাজ শুরু করে। কিন্তু কিছুদিন গর্ত খুড়াখুড়ি আর কয়েকটি ব্রিজ ভেঙ্গে ফেলে রেখে হঠাৎ করেই কাজ বন্ধ করে দেয়। প্রায় এক বছর ধরে রহস্যজনক কারণে তারা প্রকল্প এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।

স্থানীয়রাতো নয়ই, সড়ক বিভাগ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে যোগযোগ করেও কোনো সদূত্তর পাচ্ছে না। উপরন্তু ঠিকাদারদের কাছে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছে সড়ক বিভাগ।

সূত্র: দৈনিক যুগান্তর

দেশের আরো প্রতি মূর্হর্তের খবর জানুন এখানে

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *