যিনি হালাকু খানের ধ্বংসযাত্রা থামিয়ে দেন

আল্লামা ইবনে আসির (রহ.) মোঙ্গলীয় নেতা হালাকু খানের হাতে বাগদাদের পতনকে ‘ইসলামী সভ্যতার সূর্যাস্ত’ আখ্যা দিয়েছেন। ইসলামী খিলাফতের রাজধানী বাগদাদে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালান তিনি। শুধু বাগদাদ নয়, মধ্য এশিয়ার মুসলিম শাসিত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্যাপক গণহত্যা চালায় হালাকু খান ও তাঁর বাহিনী। কিন্তু সেই রক্তপিয়াসি মোঙ্গল জাতির কোনো কোনো নেতাকে আল্লাহ ইসলামের সেবক হিসেবে আবির্ভূত করেন। তেমনি একজন হলেন বারকি খান বা বিরখাই খান।

বারকি খান ছিলেন চেঙ্গিস খানের পৌত্র। অন্যান্য মোঙ্গল পরিবারের মতো শৈশবেই তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেন এবং অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ হয়ে ওঠেন। যুদ্ধের ময়দানে সাহসিকতা ও বীরত্বের জন্য জীবনে বহুবার পুরস্কৃত হন। তবে তাঁর ‘গোল্ডেন হর্ড’-এর শাসন (১২৫৭-৬৬ সাল) তাঁকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। ‘গোল্ডেন হর্ড’ ছিল তৎকালীন মোঙ্গল সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ, যা বর্তমানে তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তানসহ মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয়।

বারকি খানের ইসলাম গ্রহণ

ধারণা করা হয়, বারকি খান ১২৫২ সালে বোখারায় ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে বলা হয়, মরুযাত্রীদের একটি দল শহরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাদের আটক করে ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বারকি খান তখন ইসলামের একত্ববাদ ও অন্যান্য বিশ্বাসের ধারণা পান এবং মুগ্ধ হন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ধার্মিক জীবন যাপন করেন। কিন্তু তাঁকে নিয়ে আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল আরো সুদূরপ্রসারী।

হালাকু খানের ধ্বংসযাত্রা

হালাকু খান ছিলেন চেঙ্গিস খানের অপর পৌত্র ও বারকি খানের চাচাতো ভাই। তিনি ছিলেন অর্ধস্বায়ত্তশাসিত মোগল অঞ্চল ইলখানেতের শাসক। হালাকু খান তাঁর অনিন্দ্য সুন্দরী খ্রিস্টান স্ত্রী ডোকজ খাতুন দ্বারা প্রচণ্ড রকম প্রভাবিত ছিলেন। হালাকু খানের পছন্দ-অপছন্দ ও রাজ্য পরিচালনায় তাঁর বিশেষ নিয়ন্ত্রণ ছিল। হালাকু খান যখন নেস্টোরিয়ান চার্চ পরিদর্শনে যান তখন ‘অবিশ্বাসী মুসলিমদের’ বিরুদ্ধে খ্রিস্টান নেতারা তাঁকে খেপিয়ে তোলেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করার জন্য মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন, যে ধ্বংসাত্মক অভিযান কয়েক বছর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ১২৫৬ সালে পারস্যের বিরুদ্ধে অভিযানের মধ্য দিয়ে হালাকু খানের মুসলিমবিরোধী অভিযান শুরু হয় এবং তা শেষ হয় ১২৫৮ সালে বাগদাদ পতনের মধ্য দিয়ে। বাগদাদ দখল করার পর আব্বাসীয় খলিফা আল মুস্তাসিম বিল্লাহ ও তাঁর সন্তানদের হত্যা করেন। দামেস্কের আইয়ুবি শাসকরাও হালাকু খানের নির্দয় আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। এ সময় একটি অপ্রতিরোধ্য শক্তি এবং ‘আমার শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ মূলনীতির আলোকে ক্রুসেডার রাষ্ট্রসহ (খ্রিস্টান-মুসলিম যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী) অনেক খ্রিস্টান রাজ্য হালাকু খানকে সমর্থন জানায়।

আরো পড়তে পারেন:  জেনে নিন পালস অক্সিমিটারের ব্যবহার

মোঙ্গল ও মামলুক সংঘাত

পশ্চিম এশিয়ার বেশির ভাগ মুসলিম রাজ্য দখল করার পর হালাকু খান মামলুক সুলতানদের দিকে মনোযোগ দেন। তাঁকে সমর্থন জানায় সামন্তরাজ্য জর্জিয়া ও সিসিলিয়ান আর্মেনিয়া। তিনি নিম্নের চিঠিসহ মামলুক সুলতানের কাছে একজন দূত প্রেরণ করেন। চিঠিতে তিনি রাষ্ট্র দখল ও গণহত্যার হুমকি দেন।

হালাকু খানের চিঠির ভাষা সুলতান কুতুজকে (মালিক মুজাফফর সাইফুদ্দিন কুতুজ) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ করে। তিনি মোঙ্গল রাষ্টদূতকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাঁর উত্তর দেন, যদিও এটি ইসলামী রীতি নয়।

এটি সহজেই অনুমেয় মামলুকদের শক্তি মোঙ্গল ও তাদের মিত্রদের তুলনায় যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। চীনে ‘দ্য গ্রেট খান’ (মোঙ্গলীয় গোত্রগুলো ও সাম্রাজ্যের প্রধান) মারা যান। ফলে হালাকু খান ঘরে ফিরতে বাধ্য হন। এ ছাড়া আর্থিক সংকটের কারণে সেই বিশাল বাহিনী ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। তাঁর শত্রুদের জন্য এটি ছিল এক অপূর্ব সুযোগ, যা কাজে লাগাতে এগিয়ে আসেন মামলুক সুলতান কুতুজ ও তাঁর মিসরীয় সেনাপতি রোকনুদ্দিন বাইবার্স। তাঁদের সম্মিলিত আক্রমণে ১২৬০ সালে আইনে জালুতের যুদ্ধে হালাকু খান ও তাঁর মিত্ররা (জর্জিয়া ও আর্মেনিয়া) পরাজিত হয়। এটি মোঙ্গল বাহিনীর প্রথম পরাজয়, যাকে বলা হয় ইতিহাসের বাঁকবদলকারী যুদ্ধ।

বারকি খান ও হালাকু খানের যুদ্ধ

আইনে জালুত যুদ্ধের প্রতিশোধ নিতে ১২৬২ সালে হালাকু খান মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে আবার অভিযানের ঘোষণা করেন। প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে হালাকু খান মামলুকদের তুলনায় অনেক বড় বাহিনী গড়ে তোলেন; যদিও হালাকু খানের বাহিনীই মামলুকদের শায়েস্তা করতে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এবার তাঁকে প্রতিহত করার উদ্যোগ নেন বারকি খান। মোঙ্গল নেতা ‘গ্রেট খান’-এর উদ্দেশে এক চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘হালাকু খান মুসলিম শহরগুলো দখল করেছেন এবং খলিফাকে হত্যা করেছেন। আল্লাহর সাহায্যে আমি তাঁকে নিরপরাধ মানুষের রক্তের জবাবদিহি করতে ডাকব। হালাকু খান যেন আর কোনো মুসলিম অঞ্চলে আগ্রাসন না চালান।’

বারকি-হালাকু যুদ্ধ ১২৬২ ছিল পশ্চিমাঞ্চলীয় মোঙ্গল সাম্রাজ্যের প্রথম গৃহযুদ্ধ। ককেশাস পাহাড়ের পাদদেশে দুই বাহিনীর যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে কোনো পক্ষই চূড়ান্ত জয় বা পরাজয়বরণ করেনি। তবে এর মাধ্যমে হালাকু খানের ক্ষমতার অবসান হয়। তেরেক নদীর তীরে বারকি খানের ভ্রাতুষ্পুত্র নোগাইয়ের সঙ্গে হালাকু খানের শেষ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধের পর তিনি ফিরে যেতে বাধ্য হন। ১২৬৫ সালে হালাকু খানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মুসলমানের বিরুদ্ধে তাঁর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অবসান ঘটে।

আরো পড়তে পারেন:  আবরার হত্যা: সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ (ভিডিও)

বারকি খানও এই সংঘাতের অবসান চাচ্ছিলেন। চাচাতো ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তিনিও দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আজ মোঙ্গলদের তলোয়ারে মোঙ্গলরা কাটা পড়ছে। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হই, তাহলে আমরা পৃথিবী শাসন করতে পারব।’ হ্যাঁ, বারকি খান বসে বসে কোটি কোটি মুসলিম হত্যার দৃশ্য দেখতে চাননি। মানবিক প্রয়োজনে তিনি হালাকু খানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ান এবং তাতে তিনি সফলও হন।

বারকি খানের সাফল্য

হালাকু খানের মৃত্যুর আনুমানিক এক বছর পর ১২৬৬-৬৭ সালে বারকি খান ইন্তেকাল করেন। তিনি শান্তিপূর্ণভাবে তাঁর বড় ভ্রাতুষ্পুত্র তৈমুরের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। তিনি বারকি খানের নীতি অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করেন। ইলখানাতের বিপরীতে মামলুকসহ মুসলিম শাসকদের সঙ্গে মৈত্রী গড়ে তোলেন।

বারকি খান তাঁর সংক্ষিপ্ত শাসনামলে যে কাজ করেন তার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। বিশেষত হালাকু খানের ধ্বংসযাত্রা থামিয়ে তাঁর হাত থেকে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার মুসলিম গোত্রগুলোকে রক্ষা করেন; যদিও বেশির ভাগ ঐতিহাসিক আইনে জালুতের যুদ্ধকেই ইতিহাসের বাঁকবদলকারী আখ্যা দেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা ছিল একটি প্রাথমিক জয়। এর পরও মুসলিমবিশ্ব হালাকু খানের আক্রমণঝুঁকিতে ছিল। তা ছাড়া হালাকু খান নিজেও সেই যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন না। তবে অসম যুদ্ধে মামলুকদের বিজয় অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। এই কৃতিত্বের প্রকৃত দাবিদার বারকি খান। তাঁর বাহিনীই হালাকু খানকে ডেরায় ফিরে যেতে বাধ্য করেছিল। তিনি আরেকটি মুসলিম গণহত্যা রোধ করতে সক্ষম হন। তিনি যদি হালাকু খানকে রোধ না করতেন হয়তো ইসলামের পবিত্র ভূমিও বাগদাদের মতো রক্তে ভেসে যেত। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, বর্তমান সময়ের মুসলিম ঐতিহাসিকরা বারকি খানের এই অবদান স্মরণ করেন না।

যদিও বারকি খান কোনো দরবেশ ছিলেন না, তবে তিনি মুসলিম ভ্রাতৃত্ব লালন করতেন। সংকটপূর্ণ সময়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বর্তমান সময়ের নেতাদের মতো মিথ্যা জাতীয়তাবাদ, সীমানা, রাজনীতির কূটকৌশল ও ব্যক্তিস্বার্থ বারকি খানকে ‘উম্মাহ চিন্তা’ থেকে দূরে ঠেলে দেয়নি। এটিই বারকি খানের শ্রেষ্ঠত্ব। আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান দিন। আমিন।

তথ্যসূত্র : জ্যাকসন পিটার, দ্য মোঙ্গল অ্যান্ড দ্য ওয়েস্ট : ১২২১-১৪১০; এস ব্লেয়ার, এ কম্পেনডিয়াম অব ক্রোনিকালস : রাশিদ আল-দিনস ইলাস্ট্রেটেড হিস্টরি অব দ্য মুসলিম; জোহান এলভারস্কোগ, বুড্ডিজম অ্যান্ড ইসলাম অন দ্য সিল্ক রোড

আরো পড়তে পারেন:  বীমা সেবাকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে - প্রধানমন্ত্রী

সূত্র: কালেরকণ্ঠ

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

 আরো পড়তে পারেন:  

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *