মিয়ানমারকে ভারতের সাবমেরিন দেয়া এবং ভারতের বিমানবন্দরের জন্য বাংলাদেশের জমি চাওয়া

 

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে : দুটো বিষয়ই কাকতালীয়। একটি, মিয়ানমারকে ভারতের সাবমেরিন দেয়া এবং অপরটি, ভারতের বিমানবন্দরের জন্য বাংলাদেশের জমি চাওয়া। ক্রীড়ানক একই দেশ, আমাদের বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশী এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সহযোগী বা ভাগীদার। কিন্তু দুটোতেই ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জড়িত। অন্তত ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’ ধারণকারী ক্ষুদ্র ভূখ-, অথচ বিপুল জনগোষ্ঠির একজন ‘ক্ষুদ্র’ ভাবনার মানুষ হিসেবে, সেটাই আমার উপলব্ধি।
প্রথম বিষয়ে অর্থাৎ মিয়ানমারকে ভারতের সাবমেরিন দেয়া সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ছেপেছে গত ৩০ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সুখ্যাতির অধিকারী অনলাইন ‘ডিপ্লোমেট’ ম্যাগাজিন তাদের ‘এশিয়া ডিফেন্স’ পাতায়। শিরোনাম- ‘উইল মিয়ানমার’স নেভি গেট ইটস্ ফার্স্ট সাবমেরিন ফ্রম দ্য ইন্ডিয়ান নেভি’, যার প্রতিবেদক অঙ্কিত পান্ডা। তাতে ইকোনমিক টাইমসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, ভারত তার রাশিয়ায় নির্মিত ‘কিলো-ক্লাসের আইএনএস সিন্ধুবীর’ নামের সাবমেরিনটি আমাদের আরেক প্রতিবেশী মিয়ানমারকে দিতে যাচ্ছে। সেটি হস্তান্তরের আগে বর্তমানে তার আধুনিকায়নের কাজ চলছে ভারতের ভিজাগ বন্দরে।

সাবমেরিন ৩ হাজার টনের মালামাল নিয়ে ডুবতে পারে, দৈর্ঘ্যে ৭২.৬ মিটার ও প্রস্থে ৯.৯ মিটার; যার রয়েছে রাশিয়ান ৩এম-৫৪ ক্যালিবারের শর্ট-রেঞ্জ, সাবসনিক ক্রুজ মিসাইল ও টাইপ ৫৩ টর্পেডো ছোঁড়ার সক্ষমতা। এই সাবমেরিন হস্তান্তরের বিষয়টি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ ‘ফাইভ স্টার’ জেনারেল মিন অং হুলেয়িং-এর সাম্প্রতিক ভারত সফরকালীন চূড়ান্ত হয়েছে; যদিও ২০১৭ সালের মে মাসে মিয়ামারের প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী মেজর জেনারেল মিয়িন্ট নিউয়ি সাবমেরিনের অপরিহার্যতার বিষয়ে এক ঘোষণা দেন। কেননা তার দেশের সেনাবাহিনী ২০০৬ সালে ভারতের সাবমেরিনে চড়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
আপাতদৃষ্টিতে মিয়ানমারের সেই অপরিহার্যতা থাকতে পারে। কিন্তু মিয়ানমারের ওই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা ‘ইউএনএইচসিআর’ ২০১৬ সালে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিষ্পেষনে ‘প্রণালীবদ্ধ বৈষম্যের’ অভিযোগ আরোপ করে বলেছে, তারা ‘জাতিগত নিধন’ করেছে, যা গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ। অথচ বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে যে ভারতের কোনো তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা নেই, তাদের সাবমেরিন কোন দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য দেয়া হচ্ছে, তা গভীর পর্যালোচনার বিষয় বৈকি!

অন্যদিকে, সেই বন্ধুপ্রতীম ভারত তাদের আগরতলা বিমানবন্দর সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশের জমি চেয়েছে। ওই খবর প্রায় এক বছর পর প্রথম ছেপেছে বাংলাদেশের ইংরেজি ডেইলি নিউ এইজ। পরের দিন তা অতি গুরুত্ব দিয়ে ডেইলি স্টার ও দৈনিক আমাদের নতুন সময় ছেপেছে। এক্ষেত্রে আমাদের নতুন সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের গবেষক ও সাংবাদিকতার শিক্ষক আফসান চৌধুরী এবং সাবেক নির্বাচন কমিশনার, গ্রন্থাকার, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেনের তাৎপর্যপূর্ণ মতামত গ্রহণ করেছে। তাতে আফসান চৌধুরীর ভাষ্য, ‘এখনই তো বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের বিমান ওঠানামা করছে। ফলে বাংলাদেশের কাছে তারা জমি ব্যবহারের অনুমতি চাইতেই পারে, এটা অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়।’ অপরপক্ষে, এম সাখাওয়াত হোসেনের ভাষ্য, ‘বাংলাদেশের কাছে ভারতের জমি চাওয়াটা অস্বস্তিকর’ এবং ‘আমাদের বিমানবন্দরগুলো বড় করতে পারছি না। ভারতকে জমি দেয়াটা আমাদের পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার। ভারত চাইলে কুমিল্লার বিমানবন্দর আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহার করতে পারে। ভারতকে জমি দেয়াটা আমাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এটা একটা অর্থহীন প্রস্তাব। সরকার তা কীভাবে দেখছে সেটা দেখার বিষয়।’

আরো পড়তে পারেন:  ‘রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা ও সুরক্ষার আশ্বাস না পেলে সাক্ষ্য নেওয়া কঠিন হবে’

পাশাপাশি, ডেইলি স্টার পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হকের বক্তব্য নিয়েছে। তার ভাষ্য, ‘এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। সেটা সমন্বয়ের জন্য একাধিক মন্ত্রণালয় জড়িত।’ তার কথা, ভারতের ওই প্রস্তাব বিষয়ে ২০১৮ সালের অক্টোবরে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি বৈঠক হয়েছে। ‘সকলের ভাবনায় আমাদের ভূখ- সংযুক্ত হবে।’ তার প্রশস্তিপূর্ণ যুক্তি, জেনেভা বিমান বন্দর সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্সকে যুক্ত করেছে। উভয় দেশ পণ্য পারাপারের সুবিধা পেয়েছে। একমাত্র ২০১৮ সালেই ওই বিমানবন্দর থেকে পৃথিবীর ১৪৮টি গন্তব্যে ৫৭টি বিমান সংস্থা ১ কোটি ৭০ লাখ যাত্রী পারাপার করেছে। এছাড়াও ইউরোপ এবং আমেরিকা-কানাডা সীমান্তে সে ধরনের বিমানবন্দর রয়েছে। ‘আমি এটাকে ব্যবসা ও চলাচলের ক্ষেত্রে বৃহত্তর পরিসরে দেখছি’, জানান পররাষ্ট্র সচিব। তথাপি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, ‘ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়া এক দৃশ্যপট নয়; তাতে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, অভিবাসন ব্যবস্থা বা মুদ্রানীতি জড়িত। যদি তা যৌথ উদ্যোগে হয়, বিবেচনা করা যেতে পারে, নতুবা তা যুক্তিপূর্ণ নয়।’ আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের বক্তব্য হচ্ছে, ‘আমরা এভাবে জমি কাউকে দেই না; এখনও কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি।’

অবাক লাগে, এতো সব কথা হয়েছে এক বছর ধরে, অথচ ডেইলি স্টার জেনেছে, কী পরিমাণ জমি লাগবে, সেটা কোনো পক্ষই জানায়নি। তবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, কলকাতা ও গৌহাটি থেকে আগরতলায় বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার্য। আবার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ছিলেন এমন একজন বলেছেন, ভারত আলোকসজ্জার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়।

ফলে যত কথাই বলা হোক না কেন, একটা বিষয় পরিস্কার, তা হলো- আগরতলার মহারাজা বীর বিক্রম বিমান বন্দরের জন্য বাংলাদেশের জমি বরাদ্দ করা হলে সেটি হবে প্রবাসে বসবাসরত বৃহত্তর নোয়াখালি, কুমিল্লা ও সিলেট অঞ্চলের যাত্রীদের জন্য অতীব সাশ্রয়পূর্ণ চলাচলের বিমানবন্দর। একই সঙ্গে ওই বিস্তৃত অঞ্চলের রফতানিযোগ্য শিল্পপণ্য ও কাঁচামাল আমদানির কেন্দ্রবিন্দু হবে, সন্দেহ নেই। আমরা হব বিমানযাত্রী পরিবহনের পরিবর্তে ‘পোর্টার’ বা সোজা বাংলায় ‘মাল টানার’ দেশ। এতে ‘সাবমেরিন’ ও ‘জমি’ বিষয়ে আমাদের ‘কারো সাথে শত্রুতা নয়, সবার সাথে বন্ধুত্ব’ পররাষ্ট্রনীতিটিতে এখনই কার্যত মনোযোগী হওয়া বাঞ্ছনীয়।

সূত্র: আমাদের সময়

দেশের আরো প্রতি মূর্হর্তের খবর জানুন এখানে

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

আরো পড়তে পারেন:  বন্যার মধ্যে অ্যাম্বুলেন্সকে পথ দেখিয়ে হিরো ১২ বছরের শিশু (ভিডিওসহ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *