মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারে যেভাবে সৌদিকে পেছনে ফেলছে ইরান

 

সৌদি আরব ও ইরান। মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী দুই প্রতিবেশী দেশ। কিন্তু তাদের মধ্যে দশকের পর দশক ধরে চলছে দ্বন্দ্ব। বলা যায় একে অপরের জানের শত্রু।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি এক থিঙ্ক ট্যাঙ্কের গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবকে হারিয়ে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের কৌশলগত লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছে।

পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বিভিন্ন দেশে ইরান আর সৌদি আরব কার্যত এক ‘প্রক্সি’ বা ছায়া যুদ্ধে লিপ্ত। মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতা আর প্রভাব বিস্তার নিয়ে সৌদি আরব আর ইরানের দ্বন্দ্ব চলছে গত প্রায় চল্লিশ বছর ধরে।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) এ গবেষণায় বলা হয়েছে, রিয়াদের শতকোটি ডলার বিনিয়োগের পাল্টায় এর ভগ্নাংশ পরিমাণ খরচ করেও তেহরান এখন সিরিয়া, লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনের ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

‘মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের নেটওয়ার্কের প্রভাব’ শীর্ষক ২১৭ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদনে লন্ডনভিত্তিক এ থিঙ্কট্যাঙ্কটি জানায়, ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর ১৯৭৯ সালে দেশটির নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির দেশে প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই তারা তাদের প্রভাব সীমানার বাইরেও বিস্তৃত করার কাজ শুরু করে।

মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে সৌদি আরব দশকের পর দশক ধরে শত শত কোটি ডলারের পশ্চিমা অস্ত্রশস্ত্র কিনেছে, যার বেশিরভাগই যুক্তরাজ্য থেকে গিয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরান প্রচলিত অস্ত্রশস্ত্রে পিছিয়ে থেকেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে নেটওয়ার্ক গড়ে কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছেছে বলে আইআইএসএস জানিয়েছে।

ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র দুটি স্থান, মক্কা এবং মদিনা হচ্ছে সৌদি আরবে। কাজেই সৌদি আরব মনে করে তারা ইসলামী বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা।

কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইরানে এক ইসলামী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এলেন আয়াতুল্লাহ খোমেনি। এটি সৌদি আরবকে খুবই শঙ্কিত করে তুলল। হঠাৎ তারা দেখল, ইসলামী বিশ্বে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী এক রাষ্ট্রের উত্থান ঘটছে।

গত ৪০ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিরাট অংশ জুড়ে ইরানের প্রভাব-প্রতিপত্তি দিনে দিনে বেড়েছে। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ওমান, ইয়েমেন- এসব দেশ যেভাবে ইরানের প্রভাব বলয়ে চলে গেছে বা যাচ্ছে, তাতে সৌদিরা রীতিমতো আতঙ্কিত।

আরো পড়তে পারেন:  অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের বিকল্প আনলো হুয়াওয়ে

এর সঙ্গে ইসলামের বহু পুরনো দ্বন্দ্ব শিয়া-সুন্নি বিরোধ তো আছেই। সৌদি আরব সুন্নি আর ইরান শিয়া ইসলামের পৃষ্ঠপোষক। কাজেই সৌদি-ইরান ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের একটা ধর্মীয় মাত্রাও আছে।

ইয়েমেনে গত কয়েক বছর ধরে চলছে গৃহযুদ্ধ। সৌদি আরব লড়েছে এক পক্ষে, ইরান হুতি বিদ্রোহীদের পক্ষে। সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট আসাদকে সমর্থন করছে ইরান। সেখানে তারা সৈন্য এবং অস্ত্রশস্ত্র পাঠিয়েছে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে।

অন্যদিকে সৌদি আরব সমর্থন জোগাচ্ছে বিদ্রোহীদের। তারা অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ সবই দিচ্ছে বিদ্রোহীদের। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরানের প্রভাব অনেক বেড়ে গেছে।

এছাড়া লেবাননকে ঘিরেও ইরান-সৌদির তীব্র দ্বন্দ্ব রয়েছে। লেবানন এমনিতেই খুব জটিল রাষ্ট্র। সেখানে শিয়া, সুন্নি এবং খ্রিস্টানদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য খুবই স্পর্শকাতর একটি বিষয়।

ইরান বহু বছর ধরে লেবাননের শিয়া দল হিজবুল্লাহ এবং তাদের মিলিশিয়াকে নানাভাবে সমর্থন জুগিয়ে চলেছে। হিজবুল্লাহ লেবাননের সরকারের অংশ। কিন্তু একই সঙ্গে তারা সিরিয়া, ইয়েমেন এবং ইরাকে লড়াই করছে। যেভাবে ইরান এবং হিজবুল্লাহর প্রভাব বলয় বাড়ছে, তাতে সৌদি আরব রীতিমতো আতঙ্কিত।

মধ্যপ্রাচ্যের এই পাল্টে যাওয়া চিত্রের মূল অনুঘটক বলা হচ্ছে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর (আইআরজিসি) বৈদেশিক বিভাগ ‘কুদস ফোর্স’কে, যারা সমগ্র অঞ্চলে তেহরানের স্বার্থ রক্ষায় তৎপর।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে আল কুদস বাহিনী। এতে প্রায় পাঁচ লাখ সক্রিয় সামরিক সদস্য রয়েছে।

এই কুদস ফোর্সের প্রধান মেজর জেনারেল কাসেম সুলাইমানির সরাসরি যোগাযোগ ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সঙ্গে।

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনী সাদ্দামকে উৎখাত করার পর থেকে ইরাক ও অন্যান্য অঞ্চলে বিশেষ করে শিয়া অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে কুদস ফোর্স পেখম মেলতে শুরু করে।

সাদ্দামকে বলা হতো, মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রাচীর। ওই প্রাচীর সরে যাওয়ার পর কুদস ফোর্স তড়িৎগতিতে শক্তিবৃদ্ধির কাজ শুরু করে; বিভিন্ন গোষ্ঠীর মেলবন্ধনে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজে সচেষ্ট হয়।

আরো পড়তে পারেন:  জিনেরা কী খায় কী করে

কেবল তাই নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিদের প্রচলিত ঘরানার সেনাবাহিনীর মোকাবিলায় তারা ড্রোন ও সাইবার হামলার মতো অপ্রচলিত কিন্তু শত্রু কে ব্যতিব্যস্ত রাখার কার্যকর পথে হাঁটা শুরু করে।

সর্বশেষ ২০১১ সালে আরব বসন্তে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের কাঠামো ভেঙে পড়েছে। নতুন করে প্রভাব বিস্তারের খেলায় মাতে রিয়াদ ও তেহরান। বিশেষ করে সিরিয়া, ইয়েমেন ও বাহরাইনে প্রতিপত্তির প্রতিষ্ঠায় মরণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উভয়পক্ষই।

সিরিয়া ও ইয়েমেনে চলা সংঘাতে সৌদি আরব ও ইরানের অবস্থান বিপরীতমুখী। উভয় দেশই তাদের প্রভাব বলয় বাড়াতে তৎপর। এই দুই দেশে ইরান-সমর্থিতরা জয়ী হলে তা সৌদি আরবের জন্য সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক হুমকি সৃষ্টি করবে বলে রিয়াদের শঙ্কা।

 

সূত্র: পার্স টুডে

আন্তর্জাতিক আরো প্রতি মূর্হর্তের খবর জানুন এখানে

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *