ভুতুড়ে বিলের সন্দেহ হলে…

 

ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা রাকিবুজ্জামান খানের প্রতিমাসে বিদ্যুৎ বিল আসে ১০০০ টাকার মধ্যে। কিন্তু লকডাউনের কারণে দুইমাস পরে যে বিল এসেছে, তাতে তার প্রতিমাসের বিল এসেছে দেড় হাজার টাকা করে। অথচ তার বাসায় ফ্রিজ, টিভি আর কয়েকটি ফ্যান ছাড়া অন্য কোনো বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নেই। 

এমন ভুতুড়ে বিলের (অতিরিক্ত বিল) অভিযোগ শুধু রাকিবুজ্জামানেরই নয়। সারাদেশের অনেক মানুষেরই। এ বিল থেকে বাদ যাননি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেন, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মইন উদ্দিন, বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারাও।

বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর এমন বিলের বিষয় এখন টক অব দ্যা কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। যদিও কেম্পানিগুলো ভুল স্বীকার করে বলেছে, দুই মাসের বিদ্যুৎ বিলের হিসাব গড় করতে গিয়ে এ বিল চলে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী সমাধান করা হচ্ছে।

বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিল নিয়ে গ্রাহকরা যে সমস্যায় পড়েছেন তার জন্য এক ভার্চুয়াল মিটিংয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ সচিব ড. সুলতান আহমেদ। তিনি বলেন, গ্রাহকের ব্যবহারের বিলের অতিরিক্ত এক টাকাও পরিশোধ করতে হবে না। এ নিয়ে কোনো গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। যেসব অভিযোগ এসেছে তাদের বিল সমন্বয় করা হচ্ছে। আরো অভিযোগ এলে সেগুলোও সমন্বয় করা হবে।

এদিকে বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে ভুতুড়ে বিল সমন্বয় করতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশের চারটি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার প্রায় ৩০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ গঠিত টাস্কফোর্স।

গত ২৫ জুন এই  ভুতুড়ে বিল সমন্বয় করতে সাত দিন সময় বেঁধে দেয় টাস্কফোর্স। আর সমাধান না করতে পারলে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শাস্তি দেয়ার কথা জানানো হয়।

জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়ায় স্বস্তি ফিরেছে মানুষের মনে। দূর হয়েছে করোনাকালীন এই সময়ে বাড়তি বিলের দুশ্চিন্তা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যৎ ব্যবহারের সঙ্গে বিলের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন গ্রাহকদের বহুদিনের। জনমনে এখন এটি আরো চাউর হয়েছে।

এ বিষয়ে রাকিবুজ্জামান জানান, আমার বাসার বিদ্যুৎ বিল স্বাভাবিক সময়ে এক হাজারের মধ্যে থাকে। ফ্রিজ-ফ্যান, ল্যাপটপ, টিভি ও কয়েকটি বাতি জ্বালিয়ে বিল ৮৫০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে থাকে। আবার যখন বাসায় থাকি না তখনো এই একই বিল আসে। এই যেমন গত এপ্রিল মাসের পুরোটাই গ্রামের বাড়িতে ছিলাম, তখনো সেই একইরকম বিদ্যুৎ বিল এসেছে। বিল হয়তো হিসাব অনুযায়ী ঠিকই আছে। তবে ব্যবহারের বিষয় বিবেচনা করলে এটি নিয়ে প্রশ্ন জাগে।

এমন অভিযোগ ঢাকার অনেক ভাড়াটিয়ারই। তবে এক্ষেত্রে তাদের সন্দেহের আঙুল বাড়িওয়ালার দিকেই।  সরেজমিনে, ধানমন্ডিতে তাহেরুজ্জামান সাদ্দাম নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র বলেন, বাড়িওয়ালা অসাধু হলে এমন বিল আসতে পারে। কীভাবে জানতে চাইলে তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেন, সব বাড়িতেই প্রত্যেক ফ্লাটের জন্য আলাদা আলাদা মিটার থাকে। বাড়িওয়ালা অসাধু হলে কেয়ারটেকারের রুম, গ্যারেজের বিদ্যুৎ সংযোগ ভাড়াটিয়াদের কোনো ফ্লাটের মিটারের সঙ্গে সংযুক্ত করে দিতে পারে। সাধারণ মানুষ এসব বোঝে না। আবার সিঁড়ির বিদ্যুৎ সংযোগের হিসাবও ওই মিটারে আসতে পারে। এতে আমি আমার ফ্লাটে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে বিল তো বেশি আসবেই, আবার না করলেও আসবে। তবে এই বিষয়ে তিনি ভুক্তভোগী কি না প্রশ্ন করলে কোনো সদুত্তর দেননি।  এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন হলেও মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল হাতে আসলে এমন সন্দেহ জনমনে তাড়া  করে প্রতিনিয়ত।

আরো পড়তে পারেন:  তুরস্ক-ফ্রান্সের বাকযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বাকস্বাধীনতা

বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সন্দেহ হলে কী করবেন?

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রত্যেক গ্রাহকেরই বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতন হওয়া উচিত। বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক ইউনিট মূল্য নির্ধারণ করা আছে সরকারের। মিটার দেখে এ হিসাব করলে বিদ্যুতের প্রকৃত ব্যবহার বোঝা যাবে।

তারা বলেন, মিটারে ওঠা ইউনিট ও ব্যবহার নিয়ে অসামঞ্জস্য মনে হলে পাশের যে কোনো ফ্লাটের বিদ্যুতের ইউনিট তুলনামূলক সাপেক্ষে মিলিয়ে নেয়া যেতে পারে।

বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব যেভাবে করবেন-

ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ভয় বা সন্দেহ পোষণ একদমই ভিত্তিহীন। কারণ বিলেই উল্লেখ থাকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে কি কি খাতে কি পরিমাণ চার্জ কাটা হয়েছে। এছাড়া বিলের মোট টাকা কত তাও দেয়া থাকে। তবে মিটার দেখে অথবা ব্যবহৃত বিদ্যুতের সম্ভাব্য লোড হিসাব করে এটি মিলিয়ে নিতে পারেন। এ হিসাব বিদ্যুৎ বিলের কাছাকাছি আসলেও বিল ‘প্রকৃত’ বলে গণ্য হবে।

এক্ষেত্রে জেনে রাখতে হবে-

নিট বিল= এনার্জি বিল + মিটার বিল
(এনার্জি বিল হলো এক মাসে ব্যবহৃত ইউনিটের পরিমাণ (কিলোওয়াট) এর সঙ্গে প্রতি ইউনিটের মূল্যের গুণফল)

মিটার বিল= ডিমান্ড চার্জ + সার্ভিস চার্জ
(বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি নির্ধারিত ডিমান্ড চার্জ প্রতি কিলোওয়াটের জন্য ১৫ টাকা এবং সার্ভিস চার্জ সিঙ্গেল ফেসের জন্য ১০ টাকা আর থ্রি ফেজের জন্য ৩০ টাকা)

এবার এনার্জি বিল ও মিটার বিলের মান যোগ করলেই নিট বিল পাওয়া যাবে; যা বিদ্যুৎ বিল হিসেবে পরিচিত।

তবে কোম্পানির বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে বিল পরিশোধ না করলে কেবল জরিমানা স্বরূপ নিট বিলের সঙ্গে পাঁচ শতাংশ ভ্যাট যোগ করতে হয়। যা এই করোনাকালীন সময়ে মওকুফ করেছে সরকার।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য ইউনিটের মূল্য পৃথক নির্ধারণ আছে। সেক্ষেত্রে নির্ধারিত ইউনিটের মূল্য ধরে একই নিয়মে হিসাব করে বিদ্যুৎ বিল বের করা হয়।

বাসা-বাড়িতে গ্রাহকরা সম্ভাব্য কী ধরনের লোড ব্যবহার করে থাকেন-

সাধারণত লাইট ১৫-২০০ ওয়াট, ফ্যান ৫০-৮০ ওয়াট, টেলিভিশন ২৫-১০০ ওয়াট, ল্যাপটপ ২০-৬০ ওয়াট, রেফ্রিজারেটর ৮০-২০০ ওয়াট, এসি ১০০০-৩০০০ ওয়াট, আয়রন ৫০০-১০০০ ওয়াট, পাম্প মোটর ১/৮ থেকে ৩ হর্স পাওয়ার, ডেস্কটপ কম্পিউটার ৮০-২৫০ ওয়াট ইত্যাদি।

লোডের হিসাব যেভাবে করবেন-

লোডের পরিমাণ বের করতে হলে পাওয়ারের (p) এই সূত্র ব্যবহার করতে হবে

লোডের পরিমাণ বের করতে হলে পাওয়ারের (p) এই সূত্র ব্যবহার করতে হবে

হর্স পাওয়ার দেয়া থাকলে ৭৪৬ দিয়ে গুণ করে ওয়াটে আনতে হবে। কিলোওয়াটে নিতে চাইলে ওয়াটকে ১০০০ দিয়ে ভাগ করতে হবে। কিলোওয়াটকে সময় (ঘণ্টা) দিয়ে গুণ করে ইউনিট বের করতে হবে।

আরো পড়তে পারেন:  ঝাল ঝাল আমসত্ত্ব তৈরির রেসিপি

বিদ্যুতের ইউনিটের মূল্য বেড়ে এখন যেমন-

সবশেষ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিদ্যুতের মূল্য বাড়ায় সরকার। সে অনুযায়ী- গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম ইউনিট প্রতি ৩৬ পয়সা করে বাড়ানো হয়। একইসঙ্গে বাড়ানো হয় পাইকারি বিদ্যুতের দাম ও সঞ্চালন চার্জও।

এ দাম মার্চ মাস থেকে কার্যকর হয় অর্থাৎ এপ্রিল মাসে গ্রাহকরা এই বাড়তি দামে বিদ্যুতের বিল দেন।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের তথ্যমতে, আবাসিকের লাইফ লাইন গ্রাহকদের (০ থেকে ৫০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী) প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম করা হয়েছে ৩ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩ টাকা ৭৫ পয়সা। এরপর সাধারণ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে ০ থেকে ৭৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ টাকা ১৯ পয়সা, দ্বিতীয় ধাপে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিটের জন্য ৫ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৭২ পয়সা, তৃতীয় ধাপে ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিটের জন্য ৫ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা, চতুর্থ ধাপে ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের ইউনিট মূল্য ৬ টাকা ০২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ৩৪ পয়সা, পঞ্চম ধাপে ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত ৯ টাকা ৩০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৯৪ পয়সা এবং ষষ্ঠ ধাপে ৬০০ ইউনিটের ওপরে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা ৪৬ পয়সা করা হয়েছে।

খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর গ্রাহকরা কে কত টাকা করে বিল দেন-

লাইফ লাইন গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় ৫ টাকা থেকে ১৭ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত। গ্রাহকদের বিল ক্ষেত্রভেদে ২১৫-২১৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২২০-২২৪ টাকা এবং ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১৭ টাকা ৫০ পয়সা।

নিম্ন মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় ৪৪ টাকা। যাদের আগে বিল আসতো ৭৫৯ টাকা তাদের বিল এখন ৮০৩ টাকা। একইভাবে মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের দাম বাড়ানো হয় ১১৪ টাকা। যাদের বিল আগে আসতো ১ হাজার ৯৫২ টাকা তাদের এখন বিল আসে ২ হাজার ৬৬ টাকা। সেচ গ্রাহকদের জন্য বাড়ে ১৮৮ টাকা। আগে যেখান তাদের বিল আসতো ৩ হাজার ২৬০ টাকা, এখন দাম বাড়ার ফলে আসে ৩ হাজার ৪৪৮ টাকা। একইভাবে ক্ষুদ্রশিল্প গ্রাহকদের বাড়ে ৮১০ টাকা। আগে যেখানে তাদের বিল আসতো ১৬ হাজার ৫৫০ টাকা, এখন আসে ১৭ হাজার ৩৬০ টাকা। মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে বাড়ে ১৭ হাজার ৩৪০ টাকা। এখন যাদের বিল আসে ৩ লাখ ২৬ হাজার, তাদের বিল বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। বৃহৎ শিল্প গ্রাহকদের ক্ষেত্রে দাম বাড়ে ৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা। আগে যারা বিল দিতেন ১ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার টাকা, দাম বাড়ার পর বিল দেন ১ কোটি ৭১ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

আরো পড়তে পারেন:  হালের হার্টথ্রব সুশান্ত সিংহ রাজপুতের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

মোট ১ কোটি ৩৮ লাখ লাইফ লাইন গ্রাহকের মধ্যে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ( আরইবি)-এর অধীন ৭৫টি সমিতিতে ১  কোটি ২১ লাখ গ্রাহকের প্রত্যেকের বিল বাড়ে মাসে ৫ থেকে ৬ টাকা করে। আর বাকি ৫টি সমিতির ৬ লাখ গ্রাহক এবং ৫টি বিতরণ কোম্পানির ১১ লাখসহ মোট ১৭ লাখ লাইফ লাইন গ্রাহকের প্রত্যেকের বিল বাড়ে ১৫ থেকে ১৮ টাকা করে।

যেভাবে অভিযোগ জানাবেন-

বিল সংক্রান্ত অন্যান্য সমস্যা নিয়ে অভিযোগ জানাতে যেতে পারেন স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর অফিসে। এছাড়া কেন্দ্র ঢাকায় বিদ্যুৎ বিষয়ক সেবায় কলসেন্টার চালু রয়েছে ডিপিডিসি’র। ১৬১১৬ নম্বরে ফোন করলেই সেবা পাবেন ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) এর গ্রাহকরা।

 

সূত্র: ডেইলি বাংলাদেশ

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

 আরো পড়তে পারেন:  

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *