বেঈমান বের হয়ে যাও, মোকাব্বিরকে ড. কামাল

 

দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়া গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোকাব্বির হোসেনকে বৃহস্পতিবার অফিস থেকে বের করে দিয়েছেন গণফোরাম সভাপতি ও ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন।

ঐক্যফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতা ও গণদলের চেয়ারম্যান গোলাম মাওলা চৌধুরী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

মতিঝিলে ড. কামাল হোসেনের চেম্বারে এই ঘটনা ঘটে। গোলাম মাওলা চৌধুরী নয়া দিগন্তকে জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল ৩ টার দিকে ড. কামাল হোসেনের মতিঝিলের চেম্বারে তার সাথে দেখা করতে যান মোকাব্বের খান। এসময় গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘বেয়াদব, বেঈমান আমার অফিস থেকে এখন বের হয়ে যাও। আর কখনো আমার অফিসে আসবা না’। এসময় ড. কামাল হোসেন তার অফিসের কর্মচারীদের বলেন, ‘এই বিশ্বাস ঘাতক বেঈমানকে কখনো আমার অফিসে ঢুকতে দিবা না’। মোকাব্বের খানকে অফিস থেকে বের করে দেওয়ার বিষয়ে গণদল চেয়ারম্যান গোলাম মাওলা চৌধুরী বলেন, ড. কামাল হোসেন জাতীয় অভিভাবক হিসেবে এই বেঈমানকে বের করে দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমরা তার এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। গত মঙ্গলবার দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়নে সিলেট-২ আসন থেকে নির্বাচিত মোকাব্বির খান। ওই দিন সংসদ ভবনে স্পিকারের কার্যালয়ে তাকে শপথ বাক্য পাঠ করান স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। এর আগে ঐক্যফ্রন্টের আরেক সদস্য গণফোরাম নেতা (বহিষ্কৃত) সুলতান মনসুর শপথ নিয়েছেন।

তবে দলীয় নিয়ম ভেঙে শপথগ্রহণ করায় তাকে গণফোরাম থেকে বহিষ্কার করা হয়। মোকাব্বের খানের বিষয়ে আগামী ২০ এপ্রিল গণফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক আছে। সেখানে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন দলটির নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। সংবাদ মাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ যদি শপথ গ্রহণ করে থাকে, সেটি তার নিজ দায়িত্বে। এর সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই।

নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে গণফোরামের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও সিলেট-২ আসন থেকে নির্বাচিত মোকাব্বির খান জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। মঙ্গলবার সংসদ ভবনে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী মোকাব্বির খানকে শপথ বাক্য পাঠ করান। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংসদ সচিব জাফর আহমদ খান।

এদিকে শপথ গ্রহণের পর সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মোকাব্বির খান বলেন, নির্বাচনে আমি ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ছিলাম না। আমি বিএনপি করি না। আমি গণফোরাম করি। গণফোরামের মনোনয়ন নিয়ে সূর্য মার্কায় নির্বাচন করেছি।

শপথ অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, হুইপ ইকবালুর রহিম, হুইপ মাহবুব আরা বেগম গিনি, হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, সংসদ সদস্য উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ, আবদুল লতিফ, আবদুস সোবহান গোলাপ এবং আব্দুস সালাম মুর্শেদী উপস্থিত ছিলেন। শপথ গ্রহণ শেষে মোকাব্বির খান রীতি অনুযায়ী শপথ বইয়ে স্বাক্ষর করেন।

এরআগে সোমবার গণফোরামের প্যাডে নিজের সই করা চিঠিতে তিনি দু’একদিনের মধ্যে শপথ নেয়ার আগ্রহের কথা জানান। চিঠি দেয়ার দশ মিনিটের মধ্যে সংসদ সচিবালয় থেকে তার শপথের বিষয়টি জানানো হয়।

একাদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিএনপি-গণফোরামসহ আরও কয়েকটি দল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে অংশ নেয়। ওই নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টভূক্ত দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ছয়টি ও গণফোরাম দুইটি আসনে জয়ী হয়। ওই নির্বাচনে মোকাব্বির খান জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের হয়ে দলীয় প্রতীক উদীয়মান সূর্যে নির্বাচন করেন।

পরে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে ঐক্যফ্রন্ট মনোনীতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে গণফোরাম থেকে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে গত ৭ মার্চ শপথ নেন। পরে তাকে গণফোরাম থেকে বহিষ্কার করা হয়।

সে সময় মোকাব্বিরও শপথ নিতে চেয়েছিলেন। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি তখন আর শপথ নেননি। তবে এবার দলের সঙ্গে কথা বলেই শপথ নিয়েছেন বলে দাবি করে মোকাব্বির খান বলেন, ড. কামাল হোসেনের সিদ্ধান্ত মানেই গণফোরামের সিদ্ধান্ত। আমি দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে ২ বা ৩ এপ্রিল আমার শপথের ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য স্পিকারকে চিঠি দিয়েছি।
যদিও গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেছেন, আমরা জানতে পেরেছি মোকাব্বির খান দলের সাধারণ সম্পাদকের সই ছাড়াই দলীয় প্যাড ব্যবহার করে শপথ নেয়ার জন্য চিঠি দিয়েছেন। তিনি নিজ দায়িত্বে শপথ নিচ্ছেন। এটা তিনি ঠিক করেননি। শপথ না নেয়ার বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত এখনও বহাল আছে।

তিনি আরো বলেন, ২০ এপ্রিল দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে দলীয় প্যাড চুরি করে মোকাব্বির খান শপথের আবেদন করেছেন বলে দাবি করে গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য জগলুল হায়দার আফ্রিক বলেন, দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে দলীয় প্যাড চুরি করে শপথ নেয়ার জন্য স্পিকারকে চিঠি দিয়েছেন। মোকাব্বির কোথা থেকে, কীভাবে দলের প্যাড চুরি করেছেন, তা আমার জানা নেই।

শপথ নেয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের মোকাব্বির আহম্মেদ খান বলেন, মানসিক বিপর্যস্ত হয়ে আমার বিরুদ্ধে প্যাড চুরির অভিযোগ করেছেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জগলুল হায়দার আফ্রিক। এটি একটি অরুচিকর কথা। শুনতেও বাজে লাগে। আমি দল থেকে অনুমতি নিয়েই সংসদে এসেছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোকাব্বির খান বলেন, এর আগে ৭ মার্চ আমার শপথ নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমার দলের প্রেসিডিয়াম সভায় সিদ্ধান্ত হলো যে ৭ মার্চ শপথ না নিয়ে অন্য যে কোনো দিন আমি যেন শপথ নেই। সেদিনও কিন্তু দলের যে প্যাডে যে প্রক্রিয়ায় আমি চিঠি দিয়েছিলাম সেই একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে একইভাবে প্রেসিডিয়ামের সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদে যোগদান করেছি।

এ সময় সাংবদিকদের প্যাড দেখিয়ে তিনি বলেন, এটাকে যদি ভেরিভাই করতে চান তাহলে করতে পারেন। এখানে কোনো ধরনের বিতর্কের সুযোগ নেই। এটাকে যারা বিতর্কে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন, আমি মনে করি তারা কোনো বিশেষ মহলের পারপাস সার্ভ করছেন অথবা তারা মানসিক বিপর্যস্ত। হয়তো তাদের একটা অ্যাসাইমেন্ট ছিল। সেই অ্যাসাইমেন্ট পালন করতে না পারায় তারা এমন আচরণ করছেন।

এ ধরনের অভিযোগ উঠল কেন, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মোকাব্বির খান বলেন, আমরা সবাই আদমের সন্তান। হয়তো কেউ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। বাংলাদেশে কত ধরনের রাজনীতি হচ্ছে, অপরাজনীতি হচ্ছে। হয়তো কেউ অপরাজনীতির মানসিকতা নিয়ে বিভিন্ন মহলের ফায়দা হাসিলের জন্য এটা করে যাচ্ছেন। কারণ সব দলিলাদি যখন কথা বলে, তখন আমি মনে করি আমার নিজের মুখ থেকে তেমন কিছু বলার নেই।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ছিলাম না। আমি বিএনপি করি না। আমি গণফোরাম করি। গণফোরামের মনোনয়ন নিয়ে সূর্য মার্কায় নির্বাচন করেছি।

সংসদে গণফোরাম বিরোধী দল হিসেবে কাজ করবে দাবি করে মোকাব্বির আহম্মেদ বলেন, সংসদে আমি শতভাগ বিরোধী দলের ভূমিকা নেব। জনগণের কথা বলব। গণফোরামের যে বক্তব্য সেগুলো তুলে ধরব। দেশের জনগণের চিন্তাভাবনা আমার মুখ থেকে যেন সবাই শুনতে পায় সেই হিসেবে কাজ করব। এর আগে শুরুতেই তিনি তার নিজ নির্বাচনী এলাকার জনগণ ও নিজ দল গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ২৬ বছর আমরা দীর্ঘ সংগ্রাম করেছি। গণতন্ত্রের সংগ্রাম, আদর্শের সংগ্রাম, মূল্যবোধের সংগ্রাম। যে সংগ্রাম বঙ্গবন্ধু শুরু করেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর যে নীতি-আদর্শ-মূল্যবোধ নিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি, সেটা রক্ষা করে গণফোরাম থেকে আমি নির্বাচিত হয়েছি। আমার প্রধান কাজ ও মূল লক্ষ্য হবে সেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মূল্যবোধকে ধরে এগিয়ে যাওয়া। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি যাতে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাব। তখনই মনে হবে আমার রাজনীতি স্বার্থক, আমার দলের রাজনীতি স্বার্থক।

উল্লেখ্য, গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত হন গণফোরামের দুই নেতা সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান। ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে জয়ী হওয়া সুলতান মনসুর গত ৭ মার্চ শপথ নিয়ে এরই মধ্যে সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। ওই সময় মোকাব্বিরও শপথ নেবেন বলে জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত তখন তিনি পিছু হটেন।

সূত্র: নয়াদিগন্ত

দেশের আরো প্রতি মূর্হর্তের খবর জানুন এখানে

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *