বুড়া হলেই কুড়াল নিয়ে হাজির কসাই, এরপর…

 

ধরুন, বয়স্ক নারীটির নাম ফাতেমা। বয়সের ভারে ন্যুজ ওই নারী সংসারের ভারী কোনো কাজ করতে পারেন না। তিনি বাড়ির ছোটখাটো কাজ আর বাচ্চাদের দেখাশোনা করতেন। কিন্তু একসময় এমন অবস্থা হলো যে, তিনি আর কোনো কাজই করতে পারছেন না। তার গোত্রের লোকজনের কাছে তিনি একজন ফালতু মানুষ। তাই তাকে আর বাঁচিয়ে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। একদিন তাকে একটা নদীর ধারে নিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে একটা কুড়াল দিয়ে মাথায় আঘাত দিয়ে হত্যা করা হলো সেই বৃদ্ধাকে। এরপর সেখানেই ফেলে রেখে আসা হলো তার মরদেহ। না কোনো জানাজা, না দাফন।

ওপরের ঘটনাটি কোনো সিনেমার কাহিনী নয়, বাস্তব। বৃদ্ধাদের এভাবে হত্যা করার নিয়ম প্রচরিত আছে প্যারাগুয়ের অ্যাচে আদিবাসী সমাজে।

ওই গোত্রের লোকজন বেশি বয়সের বৃদ্ধাদের সংসারে রাখে না। এভাবে পাশবিকভাবে হত্যা করে থাকে। এজন্য একটু বয়স বাড়তে থাকলেই তটস্থ থাকতে হয় গোত্রের বেশি বয়সীদের।

এসব বৃদ্ধাদের হত্যার জন্য আলাদা কসাই রাখা আছে। তার কাজ হচ্ছে সমাজের অথর্ব নারীটিকে খুঁজে বের করা। এরপর তাকে বড় নদীটার কাছে নিয়ে গিয়ে হাতুড়ির ঘায়ে হত্যা করা। তবে বয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে কিন্তু আবার আলাদা নিয়ম। তাদের দূরে কোথাও পাঠিয়ে দেয়া হতো। আর তাদের বলে দেয়া হতো, ‘আর কখনও এখানে ফিরে এসো না।’ এরপর এই বৃদ্ধদের ভাগ্যে কি ঘটতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

পাপুয়া নিউগিনির কুয়ালঙ সম্প্রদায়ের মধ্যেও এ ধরনের প্রথা প্রচলিত রয়েছে। ওই সমাজে যখন একজন নারীর স্বামী মারা যায়, তখন তার ছেলের প্রধান দায়িত্ব হয়ে ওঠে মাকে গলা টিপে হত্যা করা।

এতো গেল আদিবাসী অ্যাচে সম্প্রদায়ের কথা। আমরা যারা নিজেদের আধুনিক ও সভ্য বলে দাবি করে সেই সমাজেও প্রবীণদের অবস্থা কিন্তু খুব বেশি ভালো না। হয়তো আমরা তাদের এভাবে হত্যা করা বা দুরে পাঠিয়ে দেই না। কিন্তু যেটা করি সেটাও কিন্তু হত্যার চেয়ে কোনে অংশে কম না। স্বাবলম্বী হয়ে বিয়ে থা করে নিজেদের সংসার শুরু করার পর ছেলেমেয়েদের কাছে বাবা-মায়েরা কেবলই আপদ। যেনতেন ভাবে এই আপনকে বিদায় করলেই যেন আমরা বাঁচি। কখনও ওল্ডহোমে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপর আর তাদের কোনো খোঁজ নেয়া হয় না। কেউ বা তাদের গ্রামের বাড়িতে নির্ভৃতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপর তাদের আর কোনো খোঁজ খবর নেয়া হয় না। নিঃসঙ্গ বাবা-মা তখন সেখানে বসে মৃত্যুর দিন গোণে। কেউ কেউ তো আবার এইসব সামাজিকতার ধার ধারে না। বৃদ্ধ বাবা বা মাকে ধরে নিয়ে গিয়ে সোজা কোনো নির্জন জায়গায় ফলে রেখে আসে। যেন ভুলেও তারা আর বাড়িতে ফিরতে না পারে। আমরা যারা সংবাদপত্রেরর সঙ্গে জড়িত, তারা প্রায়ই এ ধরনের বৃদ্ধ বাবা-মাকে উদ্ধারের নিউজ করে থাকি।

আরো পড়তে পারেন:  ভেঙে পড়েছে সংক্রমণ প্রতিরোধের সব ব্যবস্থা

তো সমাজে বেশি বয়সীদের দুরবস্থা দূর করতেই পেনশন সিস্টেম চালু করা হয়েছে। প্রাচীন রোমেও সৈনিকদের জন্য পেনশন ব্যবস্থা চালু ছিল। ‘পেনশন’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘পেমেন্ট’ থেকে।

কিন্তু শুধুমাত্র উনিশ শতকে এসে সেটা সেনাবাহিনীর বাইরের ছড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্রব্যবস্থায় পেনশন প্রথম চালু হয় জার্মানিতে, ১৮৯০ দশকে, যা চালু করেছিলেন তৎকালীন জার্মান চ্যান্সেলর অট্টো ভন বিসমার্ক।

কিন্তু বয়স্ক মানুষদের সেবা প্রাপ্তির বিষয়টি এখনো বিশ্বে একটি সমস্যা হয়েই রয়ে গেছে। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বয়স্ক মানুষ কোন পেনশন পায় না। আবার অনেকে এতো সামান্য অর্থ পেনশন হিসাবে পান, যা দিয়ে তাদের ভরণপোষণ চলে না।

অনেক দেশে তরুণ প্রজন্মকে এমনভাবে গড়ে তোলা হয় যে, আশা করা হয় একসময়ে তারা বয়স্কদের দেখভাল করবে। কিন্তু সেই আশা পূর্ণ হওয়ার ব্যাপারটি অনেক সময় চ্যালেঞ্জ হিসাবে থেকে যায়।

অনেক বছর ধরেই অর্থনীতিবিদরা সতর্ক বার্তা দিয়ে আসছেন যে, পেনশন ব্যবস্থায় একটি সংকট তৈরি হতে যাচ্ছে। সমস্যাটি আসলে ভৌগলিক।

অর্ধশতক আগে, ধনী দেশগুলোর একটি সংস্থায় অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থাভুক্ত (ওইসিডি) সদস্য দেশগুলোতে গড়পড়তা ৬৫ বছর বয়সী একজন নারী আরো ১৫ বছর বেঁচে থাকার আশা করতে পারতেন। এখন তারা আশা করতে পারেন বিশ বছর।

একই সময়ে এসব দেশে পরিবার প্রতি শিশু জন্মহার ২.৭ থেকে কমে ১.৭-এ নেমে এসেছে। যার মানে হলো, বসস্কদের নির্ভর করার মতো পরবর্তী প্রজন্মের সংখ্যা কমেছে। তাই পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, নিজেদেরই নিজেদের জন্য কিছু করে রেখে যেতে হবে। অর্থাৎ বৃদ্ধ বয়সে খরচপাতির জন্য শক্ত সামর্থ্য থাকতেই পর্যাপ্ত অর্থ সঞ্চয় করে রেখে যেতে হবে। যাতে বৃদ্ধ বয়সে কোনো আর্থিক সঙ্কটে না পড়তে না হয়। এজন্য সরকারিভাবেও এগিয়ে আসতে হবে। বৃদ্ধকালীন সময়ের জন্য কিছু বিশেষ পেনশন স্কিম বা সঞ্চয়পত্র চালু করতে পারে সরকার।

আরো পড়তে পারেন:  ইরানের প্রতিক্রিয়া: সৌদিকে তার গোপন পরমাণু তৎপরতার জবাব দিতে হবে

আমরা যদি মর্যাদাপূর্ণ একটি বৃদ্ধ বয়স চাই, তাহলে সেটা নিয়ে এখনি ভাবা উচিত, সেটা পরিষ্কারভাবে বলা উচিত এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

 

সূত্র: যুগান্তর

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

 আরো পড়তে পারেন:  

Loading...
আরো পড়তে পারেন:  দেশব্যাপী মাথা ন্যাড়া করার হিড়িক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *