বহু নাটকের পর শপথ

 

নানা নাটকীয়তা শেষে বিএনপি সংসদে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ী চার সাংসদ শপথ নেওয়ার পর রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান। আজ তার নিজেরও শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। স্পিকার ডাকলেই তিনি শপথ নিতে সংসদে যাবেন।

সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শপথ গ্রহণ করেছেন বিএনপি নেতারা। সংসদে সীমিত পরিসরে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও গণতন্ত্রের জন্য কথা বলতেই শপথগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বাধীন বিএনপির এই সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের জন্য অনেক স্বস্তির এবং বিএনপির জন্য ইতিবাচক হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপি সংসদে যোগ দেওয়ায় একপেশে নির্বাচনের দায় থেকে রক্ষা পাবে সরকারপক্ষ। তবে বিএনপিও নবম সংসদের পর দশম সংসদ বর্জন করে জনগণের কাছে আস্থাহীন হয়ে পড়ে। এবার নির্বাচনের ফলাফলেও সেই প্রভাব পড়েছে। তাই দলীয় নেতাকর্মীদের চাপে এবং শীর্ষ পর্যায় থেকে সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্তে খুশি নেতাকর্মীরা।

চার এমপি শপথ নেওয়ার এক ঘণ্টা পর অনেকটা নাটকীয়ভাবেই বিএনপি দলীয়ভাবে সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।  হঠাৎ কী এমন হলো যে দলীয়ভাবে শপথ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল এমন প্রশ্নে ফখরুল বলেন, শীর্ষ পর্যায় থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গতকাল দুপুরেও মির্জা ফখরুল এবং দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী পৃথক অনুষ্ঠানে বলেন, বিএনপির শপথ নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। এর আগে রবিবার দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, বিএনপির শপথ নেওয়া এমপিদের মতো দু-চারজনকে বাদ দিলে এত বড় দলের (বিএনপির) কিছুই হবে না। যারা শপথ নেবে তারা বেইমান। তবে গতকাল সন্ধ্যায় রিজভী বলেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশেই তারা সংসদে যাচ্ছেন।

গত রবিবারই এই চার সংসদ সদস্যের শপথ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা শপথ নিতে আগ্রহী চার সদস্যকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। তাদের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে কথা বলেন। বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের জামিনের বিষয়ে হয়তো কোনো আশ্বাস পাওয়া গেছে, সেই ভিত্তিতেই বিএনপির সিদ্ধান্তের এই নাটকীয় মোড়। তারা মনে করেন, আজ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার আপিলের শুনানিতে জামিন পেতে পারেন তিনি। 

বিএনপির এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। দলের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা শুরু থেকে চেয়ে এসেছি বিএনপির নির্বাচিত নেতারা সংসদে ফিরুক। তারা কথা বলুক, দাবি-দাওয়া সংসদে উত্থাপন করুক। আমরা চাই প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণমূলক সংসদ।’ 

সরকারপক্ষ থেকে কোনো চাপে বিএনপি সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কি না- এ প্রশ্নে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ বলেন, ‘বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংসদে এসেছেন মূলত তাদের নির্বাচনী আসনের জনগণের চাপে। আমি মনে করি, শপথ নেওয়া সংসদ সদস্যরা নিজ এলাকার জনগণকে সম্মান জানিয়েছেন এর মধ্য দিয়ে।’ এ সময় শপথ নেওয়া সংসদ সদস্যদের অভিনন্দন জানান হানিফ।

বিএনপির সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সঠিক মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিএনপিপন্থি পেশাজীবীদের নেতা অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপির এখন উচিত হবে নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নেওয়া। তাদের আরও আগেই সংসদে যাওয়া উচিত ছিল। তবে সংসদে সংখ্যার দিক থেকে কম হলেও সরকার পক্ষকেও  বিএনপির ও অন্যান্য বিরোধী দলের সদস্যদের মতপ্রকাশের সুযোগ দেওয়া উচিত। বিএনপি সংসদে যোগ দেওয়ায় আওয়ামী লীগের জন্যও জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ইতিবাচক হয়েছে। বিএনপি অবশ্যই এক্ষেত্রে অনেক ভালো কাজ করেছে। এমাজউদ্দীন আরও বলেন, তবে সংসদ কার্যকর রাখা নির্ভর করছে ক্ষমতাসীন দলের ওপর। তারা যদি বিএনপির ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখে এবং তাদের সংসদে কথা বলতে না দেওয়া হয় তবে সংসদ কার্যকর হবে না।

এ প্রসঙ্গে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি ছাড়াও সব বিরোধী দলকেই কথা বলা সুযোগ দেওয়া হবে। এটা তাদের অনেক আগেই বলেছি।’

তবে বিএনপির একাধিক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতা যারা মন্ত্রী ছিলেন এবং এমপি ছিলেন তারা এবার নির্বাচিত হতে না পারায় সংসদ বিমুখ ছিলেন। তারা বলেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এই সিদ্ধান্তে খুশি। তবে সংসদে গিয়ে দলীয় নেতকর্মীদের ওপর যেসব মামলা ঘুরছে সেগুলো তুলের নেওয়ার দাবিকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানান ওই ভাইস চেয়ারম্যানরা। 

এদিকে হঠাৎ করে বিএনপির এই সিদ্ধান্ত পাল্টানো নিয়ে দলের অভ্যন্তরে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নেপথ্যে কোনো চাপ বা কারণ রয়েছে কি না- এই প্রশ্নে দলের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রাজনীতিতে এরকম হয়েই থাকে। বিএনপি সংসদেই যেতে চেয়েছিল। নির্বাচনে কারচুপি হবে জেনেও আমরা অংশ নিয়েছি। চাপের বিষয়টি আমার মনে হয় না সঠিক।’

গতকাল রাত পৌনে ৮টার দিকে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান। এর আগে তিনি শরীর অসুস্থ বলে শপথ নেওয়ার সময় বাড়ানোর জন্য জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে আবেদন করেন। আজ তিনি শপথ নিতে পারেন। আপনি শপথ নেবেন কি না জানতে চাইলে ফখরুল বলেন, সময় হলে দেখতে পাবেন।

এর আগে সোমবার বিকেলে সংসদ ভবনে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বিএনপির নির্বাচিত চার সংসদ সদস্যকে শপথবাক্য পাঠ করান। এদিন শপথ নেন বগুড়া-৪ আসনের মোশারফ হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের মো. আমিনুল ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের মো. হারুন অর রশীদ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া। এর আগে শপথ নিয়েছেন ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের জাহিদুর রহমান জাহিদ ও গণফোরামের মোকাব্বির খান এবং সুলতান মোহাম্মদ মনসুর।

বিএনপির শপথ নেওয়া সব এমপিই বলেছেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। সংসদেও পুনর্নির্বাচনের দাবি জানাবেন তারা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে বিএনপি শপথ না নেওয়ার ঘোষণা দিলেও গত বৃহস্পতিবার ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির জাহিদুর রহমান জাহিদ শপথ গ্রহণ করেন। পরে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ও মিত্ররা। মাত্র ৮টি আসন পায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। নির্বাচিত আটজনের মধ্যে ছয়জন বিএনপির আর দুজন গণফোরামের। তবে নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে তা প্রত্যাখ্যান করে ঐক্যফ্রন্ট।

গণফোরামের দুই সংসদ সদস্যের মধ্যে মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে বিএনপির প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর গত ৭ মার্চ শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেন। এরপর ২ এপ্রিল শপথ নেন সিলেট-২ আসন থেকে গণফোরামের প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত মোকাব্বির খান। একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের শপথ নেওয়ার ক্ষেত্রে গতকালই ছিল শেষ দিন। অধিবেশন শুরুর পর ৯০ দিনের মধ্যে কেউ শপথ না নিলে ওই আসনে নতুন নির্বাচন আয়োজনের কথা নির্বাচন কমিশন এরই মধ্যে জানিয়েছে।

প্রসঙ্গত, নবম জাতীয় সংসদে বিএনপি মাত্র ২৮টি আসন পেয়ে বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল। কিন্তু ওই ৫ বছর বেশিরভাগ সময়েই বিএনপি সংসদ সদস্যরা অধিবেশনে অনুপস্থিত ছিলেন। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করায় বিএনপি সংসদের বাইরে থেকে যায়। সেই সময়ও দলের তৃণমূলসহ বেশিরভাগ নেতাকর্মীই নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। গত ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও দলটি ছিল নেতিবাচক। শেষ পর্যন্ত গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে দলটি অংশ নেয়।

সূত্র: দেশ তেপান্তর

দেশের আরো প্রতি মূর্হর্তের খবর জানুন এখানে

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *