প্রাইভেট সেক্টরে সরকারের স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত করোনা পরিস্থিতিকে জটিল করছে

 

আমার পরিচয় আমি একটি প্রাইভেট হাসপাতালের মালিক। তার থেকে বড় পরিচয় আমি একজন সার্জন। গত ৩০ বছর যাবত এদেশে আমি প্র্যাকটিস করে আসছি। অথচ করোনা মহামারীর এই সময়ে আমাদেরকে ঢালাওভাবে বলা হচ্ছে, আমরা নাকি প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করে দিয়েছি।

চিকিত্সা পেশায় গত ৩০ বছরের জীবনে এরকম আশঙ্কা আমার কখনো তৈরি হয়নি যে একটা রোগীর চিকিত্সা করাতে গিয়ে আমি নিজেই রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যাবো। কিন্তু কভিড-১৯ এমন একটা রোগ যার চিকিত্সা একই হাসপাতালে নরমাল রোগীর চিকিত্সার পাশাপাশি করা যাবে না। এটা আমরা সবাই স্বীকার করি এবং মানিও। অথচ এই পরিস্থিতিতেও আমাদেরকে বলা হচ্ছে রোগী দেখার জন্য। আবার এটাও বলা হচ্ছে জ্বর বা গলা ব্যথার চিকিত্সা করাবেন না।

এখানে বলা দরকার, রোগীর জ্বর একটি উপসর্গ, গলাব্যথা একটি উপসর্গ, শ্বাসকষ্টও একটি উপসর্গ—এগুলো কিন্তু কোন রোগ নয়। ইএনটির প্রায় সব কারণেই কিন্তু গলা ব্যথা হয়। আমার কাছে অ্যাপেন্ডিক্স, গলব্লাডার, প্যানক্রিয়াটাইটিসসহ নানা রোগী আসে। এখন একটা অ্যাপেন্ডিক্স এর রোগী  চেম্বারে আসলে কিভাবে নিশ্চিত হবো যে তিনি কভিড আক্রান্ত নন? কেননা আমার হাসপাতালে ল্যাব থাকলেও কভিড শনাক্তকরণের অনুমতি সরকার দেয়নি। অর্থাত্ রোগীর অবস্থা জানার কোনো অধিকার আমাকে দেয়া হয়নি। তা শুধু সরকার নিজের কাছেই রেখে দিয়েছেন। আমার জানামতে, বেসরকারী সেক্টরের এক হাসপাতাল মালিক সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে বহু চেষ্টা করেও এই কভিড সনাক্তকরণ পরীক্ষা করার অনুমতি পাননি। তাহলে বিষয়টা সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বিষয় হয়ে গেল না?

আমরা প্রাইভেট মেডিক্যাল সেক্টর চাই না যে এই পরীক্ষা নিয়ে আমার ব্যবসা করি। আমাদেরকে যদি ব্যবসার কথাই বলা হয় তাহলে বলবো দেশের ৭০ ভাগ মানুষের চিকিত্সা সেবা দিচ্ছি আমরা। অথচ এখন বলা হচ্ছে, আমরা পালিয়ে গেছি! এমন ন্যাক্কারজনকভাবে আমাদেরকে তুলে ধরে বরং সরকারি ঊর্ধ্বতন মহল নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে বলে আমি মনে করি। আমাদের সংগঠনের ১২০০ সদস্য আমরা কেউ পালিয়ে যাচ্ছি না, যাইনিও। আমরা সব ধরনের রোগের চিকিত্সা দেই। কিন্তু জ্বর এবং শ্বাসকষ্ট নিয়ে কেউ আসলে সেটা কভিড রোগী কিনা তা না জেনে কিভাবে চিকিত্সা করতে বলেন?

আরো পড়তে পারেন:  করোনা যুদ্ধে চিকিৎসক সমাজের প্রথম শহীদ ডা. মঈনউদ্দিন

ডেঙ্গুতে যখন প্রথম ক্যাজুয়ালিটি হল তখন ডেঙ্গু না জেনে অপাারেশন করায় একজন চিকিত্সক পর্যন্ত মারা গিয়েছিল। এপেন্ডিক্সের ক্ষেত্রে সাধারণত প্লাটিলেট কাউন্ট করা হয় না। কিন্তু ডেঙ্গুর উপসর্গ হতে পারে পেটের ব্যথা। অপারেশন করার পর দেখা গেল সেই রোগীর আর রক্তক্ষরণ বন্ধ হচ্ছে না। একপর্যায়ে সেই রোগী মারা যায়। সেটা হয়তো অজানা কারণে একটা রোগী মারা গেল। কিন্তু এখন যদি নিশ্চিত না হয়ে একটা কভিড রোগীর গলব্লাডার অপারেশন করি, তাহলে অপারেশন থিয়েটারে আমি সহ আরো ৮/১০ জনের যে টিম আছে তারাও কভিড আক্রান্ত হবে। তাদের থেকে পরিবারের সদস্যরাও সংক্রমিত হবে। এভাবে বারুদের মতো ছড়িয়ে যাবে। এর দায় তখন কে নেবে?

পিপিই নিয়ে আমি কোন প্রশ্ন তুললাম না। সরকার বলছে পিপিই আছে, আমিও ধরে নিলাম আছে। কিন্তু পিপিই পড়লেই যে কেউ কভিড আক্রান্ত হবে না—এমন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে? আপনারা নিজেরা ভিডিও মিটিং করেন অনলাইনে। আর আমাদেরকে বলেন প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখতে। একটা রোগীর সঙ্গে তিন-চারজন অ্যাটেনডেন্স থাকে। ওই রোগী যদি কভিড পজিটিভ হয় এবং বাকি ৩/৪ জনের একজন যদি কভিড ক্যারিয়ার হয় তাহলে সেই চিকিত্সক এবং সেই হাসপাতালের অবস্থাটা কি হবে ভেবে দেখেছেন কখনো?

আপনি চোরকে বলছেন চুরি করো আর গৃহস্থকে বলছেন ধরো—এটা কি ধরনের কথা হলো? সারা পৃথিবীতে যেখানে ‘বুথ’ করে রাস্তায় রাস্তায় কভিড টেস্ট করা হচ্ছে; সেখানে বাংলাদেশে কয়েকটা সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কোথাও কভিড পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। আমার কথা হল, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এই পরীক্ষাটা করার অনুমতি দিয়ে সরকার সেটার নজরদারি করুক। প্রয়োজনে ডেঙ্গু সনাক্তকরণ পরীক্ষার মতো রেট নির্ধারণ করে দিক। ব্যবসার দরকার নেই। ওই পরীক্ষা বাবদ যে টাকা সেটাও সরকার নিয়ে যাক।

প্রাইভেট সেক্টরের হাসপাতালকে শুধু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে এদেশের অন্যতম হেলথ সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে দেখুন। আপনারা ৫০০ টেস্টের ব্যবস্থা করে যে টাকাটা হয় তার পুরোটাই নিয়ে যান; তাতেও আমাদের কোন আপত্তি নেই। আজ যদি ল্যাবএইড, পপুলার, মেডিনোভার মতো প্রতিষ্টানগুলিকে কভিড সনাক্তকরণের অনুমতি দেয়া হয়। তবে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, সরকারি সেন্টারগুলো থেকে অনেক বেশি মানুষ সেখানে পরীক্ষা করাবে। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা তো এটা পছন্দ করছে না।

আরো পড়তে পারেন:  ৫০ লাখ সিম বন্ধ!

আমি মনে করি, প্রাইভেট সেক্টরের ব্যাপারে সরকারের স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত করোনা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। এসব করে সরকার যদি মনে করে কভিড সংক্রমণ ঠেকাবে—তাহলে আমি বলবো, আমরা সবাই একযোগে আগুনে ঝাপ দিচ্ছি। এরজন্য দায়ী হবে কিন্তু সরকারের নীতিনির্ধারকরাই। তাই এখনো সময় আছে, পরিস্থিতিকে জটিল না করে সময়ের নিরিখে, বাস্তবতার নিরিখে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবুন।

লেখক : চেয়ারম্যান ও চিফ সার্জন, জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল (জেবিএফএইচ)। সভাপতি, সোসাইটি অব এন্ডো-ল্যাপারোস্কপিক সার্জনস অব বাংলাদেশ (এসইএলএসবি)।

মতামত লেখকের নিজস্ব, কর্তৃপক্ষের নয়

 

সূত্র: কালেরকণ্ঠ

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

 আরো পড়তে পারেন:  

Loading...
আরো পড়তে পারেন:  শিশুর খাদ্যনালি থেকে বের হলো স্পাইডারম্যান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *