পুলিশের এএসআই রিয়াজ বাহিনীর অপর নাম ছিল ‘আতঙ্ক’!

 

মো. সানোয়ার হোসেন, মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি- পুলিশের এএসআই রিয়াজুল ইসলাম যেন এক আতঙ্কের নাম। তার ভয়ে দিনের পর দিন আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটিয়েছেন এলাকাবাসী।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের বাঁশতৈল ফাঁড়ির এই পুলিশ কর্মকর্তা শুধু একা নন, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তিনি পুরো একটি বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন! যেখানে কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও কথিত সোর্স ছিলেন।  ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এতদিন এলাকার নিরীহ মানুষগুলোকে জিম্মি করে রেখেছিল তারা।

কখনো সিএনজির পিছনে ইয়াবা রেখে, কখনো মাদক কারবারিকে যাত্রী বেশে ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেলে উঠিয়ে, কখনো সোর্স দিয়ে ডেকে নিয়ে ভিন্ন পন্তায় অহেতুকভাবে বিভিন্ন জনকে মাদকের মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে সম্প্রতি ইয়াবা কান্ডে বরখাস্ত হওয়া টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বাঁশতৈল ফাঁড়ির এএসআই রিয়াজুল ইসলাম ও কনস্টেবল তোজাম্মেল হক, কনস্টেবল রাছেলুজ্জামানের বিরুদ্ধে।

কনস্টেবল গোপাল সাহা ও হালিমও তাদের অপকর্মের সঙ্গী হিসেবে কাজ করতেন। সরজমিনে বাঁশতৈল ইউনিয়ন পরিদর্শন করলে অসংখ্য মানুষ তাদের অত্যাচার ও অপকর্মের কথা তুলে ধরেন।

বাঁশতৈল ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় ইউপি মেম্বার মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, নিরীহদের শুধু মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে অর্থ আদায় নয় বরং অর্থ আদায়ের আগে ধৃত ব্যক্তিকে তার সোর্স হিসেবে কাজ করে আরও লোককে ধরিয়ে দেওয়ার শর্ত দিয়েই তাদের ছেড়ে দিতেন তিনি। সিগারেট পর্যন্ত খায়না এমন অনেক ছেলেকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়ে অর্থ আদায় করেছেন তিনি। কামিয়েছেন কোটি টাকা।

উপজেলার বাঁশতৈল পশ্চিমপাড়া গ্রামের মো. দুলাল মিয়ার ছেলে স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. আলম বলেন, প্রায় ৬ মাস আগে একদিন এএসআই রিয়াজুল তাকে ফোন করে ডেকে নেন। পরে তাকে বিএনপি’র রাজনীতি করার অপবাধ দিয়ে ভয় দেখিয়ে ১৪ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়।

বাঁশতৈল স্কুল পাড়া এলাকার আমজাদ হোসেন ওরফে আমজাদ কসাই অভিযোগ করেন, তার ছেলে শাহিন (২১) কে একদিন সন্ধ্যায় বাঁশতৈল বাজারে তল্লাসির নামে জনসম্মুক্ষে ২ পিছ ইয়াবা বড়ি পকেটে ঢুকিয়ে ২৭ হাজার ৫শত টাকা আদায় করেন এএসআই রিয়াজুল। তবে সে সময় ছেলে বিদেশ যাওয়ার কথা থাকায় তিনি এনিয়ে কোন বাড়াবাড়ি করেননি বলেও জানান।

আরো পড়তে পারেন:  মুসলিম উম্মাহর সমস্যা সমাধানে একত্রিত হচ্ছে ৫ দেশ

বাঁশতৈল বাজারের রিক্সাচালক মোস্তফা বলেন, এএসআই রিয়াজের সোর্স হিসেবে কাজ করা রফিক একদিন তাকে কয়েকটি সিগারেট নিয়ে ভাঙ্গা হাসপাতাল নামক জায়গায় যেতে অনুরোধ করেন। এরপর সেখানে যাওয়া মাত্রই এএসআই রিয়াজ তাকে ২ পিস ইয়াবা দেখিয়ে জেলে নেওয়ার হুমকি দিয়ে আদায় করেন ২০ হাজার টাকা। লজ্জায় এ ঘটনা বাড়ির লোকজনদের জানাননি তিনি।

এর আগে এএসআই রিয়াজ তাকে সোর্স হিসেবে কাজ করার কথা বললে তাতে রাজি না হওয়ায় মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। এর ঠিক ৩ দিন পরই তাকে ইয়াবা বড়ি খাওয়ার বদনাম দিয়ে ওই টাকা আদায় করেন তিনি।

বাঁশতৈল বাজারের আরেক ব্যবসায়ী শহিদুল জানান, বেশ কিছুদিন আগে মোটরসাইকেল মেরামত করতে বাজারের নাজমুলের গ্যারেজে গেলে নাজমুল তাকে বসিয়ে রেখে একটু বাইরে যায়। এর একটু পরেই হুরমুর করে এএসআই রিয়াজ ও তার সাঙ্গপাঙ্গ গ্যারেজে ঢুকে গাঁজা খাওয়ার মিথ্যে অপবাদ দিয়ে হাতিয়ে নেয় ৯ হাজার টাকা।

বাঁশতৈল এলাকার রাজমিস্ত্রী মামুন জানান, প্রায় ১৫ দিন আগে বাঁশতৈল ফাঁড়ির পশ্চিম পাশ দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে এএসআই রিয়াজুল ও কনস্টেবল তোজাম্মেল তাকে অহেতুক থানায় ধরে নিয়ে গিয়ে তার কাছে ১০০ গ্রাম গাজা আছে অপবাদ দিয়ে মামলার ভয় দেখিয়ে ১০ হাজার টাকা আদায় করেন।

কেবিএম ইটভাটার মালিক রাসেল মিয়া বলেন, এই এএসআই রিয়াজ ও তার বাহিনী মাঝে মাঝেই তার ও পাশ্ববর্তী ইটভাটায় গিয়ে নিরীহ দিনমজুর শ্রমিকদের ধরে জুয়া ও মাদকের অপবাদ দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিতো। ভাটার কাজের স্বার্থে টাকা দিয়ে তিনি অনেকবার বেশকিছু শ্রমিককে ছাড়িয়ে এনেছেন। অথচ তার ভাটার শ্রমিকরা কোন ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিলোনা তার দাবি। তবে ঝামেলা এড়াতে এনিয়ে তিনি বাড়াবাড়ি করেননি।

এলাকাবাসীর দাবি, বিগত সময়ে এভাবে ভয়ভীতি ও মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কোটি টাকার উপরে আদায় করেছেন তারা। তাই দুদকের মাধ্যমে তাদের সম্পদের হিসাব বের করারও দাবি জানান তারা।

আরো পড়তে পারেন:  বিপিএল নিলামে দেশি ক্রিকেটাররা কে কোন ক্যাটাগরিতে, ভিত্তিমূল্য কত?

ক্ষোদ বাঁশতৈল ফাাঁড়ির ইনচার্জ সাইফুল ইসলামও স্বীকার করেন এএসআই রিয়াজুলের চলাফেরা ও কাজকর্ম পুলিশ বাহিনীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিলো। এজন্য সবসময় তাকে সতর্ক করতেন তিনি।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (২৮ নভেম্বর) সন্ধ্যায় বাঁশতৈল ফাঁড়ির এএসআই রিয়াজের নেতৃত্বে সাদা পোশাকে ৫ সদস্যদের একটি পুলিশ টিম টাঙ্গাইলের সখিপুর থানাধীন হাতিয়া রাজাবাড়ি এলাকার ভাতকুড়া গাবিলার বাজারে গিয়ে ওই এলাকার ফরহাদ মিয়ার ছেলে বজলুুর পকেটে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করেন। এক পর্য়ায়ে সিএনজিতে উঠানোর চেষ্টা করলে তার চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে গেলে বজলু বলেন তাকে ইয়াবা ট্যাবলেট দিয়ে ফাঁসানো হচ্ছে।

ইতোপূর্বেও এমন ঘটনা ঘটনায় তারা ওই পুলিশ সদস্যদের সার্স করে ২৫ পিস ইয়াবা পায়। পরে তাদের গণধোলাই দিয়ে আটকে রাখে এলাকাবাসী। তবে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় পুলিশ কনস্টেবল তোজাম্মেল ও সোর্স হালিম। ঘটনার সংবাদ পেয়ে মির্জাপুর থানার পুলিশ ও সখিপুর থানার ঘটনাস্থলে গিয়ে ২৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ ওই পুলিশ সদস্যদের আটক করে।

সখিপুর থানার পরিদর্শক ( তদন্ত) লুৎফুল কবির জানান, এ ঘটনায় সখিপুর থানা ৫ পুলিশ সদস্য ও তাদের দুই সোর্সের বিরুদ্ধে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত ৩ পুলিশ সদস্য ও সোর্স হাসান মিয়াকে দুই দিনের রিমান্ডের আনা হয়।

শনিবার (৩০ নভেম্বর) গ্রেপ্তার করা হয়েছে পলাতক সোর্স আল আমিন। তবে এখনো পলাতক রয়েছেন কনস্টেবল তোজাম্মেল ও হালিম। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এ ঘটনায় বরখাস্তকৃতরা হলেন, বাঁশতৈল ফাঁড়ির সেই পুলিশ সদস্য মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া থানার গুলরা গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে এএসআই রিয়াজুল ইসলাম, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থানার মোজাটি গ্রামের আক্তারোজ্জামানের ছেলে কনস্টেবল মো. রাসেলুজ্জামান, কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি থানার ঢুলুদিয়া গ্রামের জীবন সাহার ছেলে কনস্টেবল গোপাল সাহা, কনস্টেবল তোজাম্মেল ও হালিম।

সূত্র: সময়য়ের কণ্ঠস্বর

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

আরো পড়তে পারেন:  এবার কাবা শরিফ তাওয়াফ ও সাঈ-তে বৈদ্যুতিক গাড়ি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *