পাপিয়াকাণ্ডে জড়িত থেকেও রেহাই পাচ্ছেন তারা

 

পাপিয়াকান্ডে শতাধিক গ্যাং লিডার ও অপরাধী রাজনীতিবিদের নাম উঠে এলেও তাদের অপরাধ-অপকর্মের ফিরিস্তি ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রেসনোট তাদের রক্ষাকবজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ৭ মার্চ দেওয়া ওই প্রেসনোটে পাপিয়ার সঙ্গে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জড়িয়ে বিভ্রান্তিকর কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচার করা থেকে বিরত থাকার বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়। এই প্রেসনোটকে পুঁজি করেই চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী, পেশাদার সন্ত্রাসী, দেহ-বাণিজ্যের নেপথ্য গডফাদাররাও রাতারাতি ‘বিশিষ্টজনে’ পরিণত হয়েছেন। প্রেসনোটের কারণে তাদের অপরাধ-অপকর্ম নিয়ে কোনো প্রতিবেদন প্রস্তুতের ঝুঁকিও নিচ্ছেন না কেউ। ফলে পাপিয়ার সঙ্গে জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে রাতারাতি শত কোটিপতি হয়ে ওঠা অনেকে প্রশাসনিক তদন্ত থেকেও রেহাই পেয়ে যাচ্ছেন, তাদের সব অপকর্মও ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে।

সদ্য বহিষ্কৃত যুব মহিলা লীগ নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ ও তার স্বামী মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমন গ্রেফতার হওয়ায় রাজধানীর অভিজাত এলাকায় জমজমাট নারী ব্যবসাসহ ভয়ঙ্কর সব অপরাধমূলক কর্মকান্ডের খবর এখনো মানুষের মুখে মুখে। বেপরোয়া অপরাধ অপকর্মে ধনাঢ্য হয়ে ওঠা পাপিয়া-সুমন দম্পতি নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে অস্ত্রবাজ সন্ত্রাসী বাহিনীও গড়ে তোলেন। বিশ্বখ্যাত ওলি খাজা মাঈনুদ্দিন চিশতির নামের সংক্ষেপ ‘কে.এম.সি’ ব্যবহার করেই অস্ত্রবাজ বাহিনীটির নামকরণও করেন তারা। র‌্যাবের অভিযানে পাপিয়া-সুমন দম্পতি গ্রেফতার হলেও তাদের প্রতিষ্ঠিত সেই কেএমসি বাহিনীর কোনো সদস্য এখন পর্যন্ত গ্রেফতার হয়নি। বরং পাপিয়ার অবর্তমানে তারই দুই ভাই সাব্বির আহমেদ ও সোহাগ আহমেদের নেতৃত্বে কেএমসি বাহিনীর দৌরাত্ম্য চলছে যথারীতি। পাপিয়া গ্রেফতারের ঘটনায় ‘কেএমসি বাহিনী’র সদস্যরা কয়েক দিন গা-ঢাকা দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেও আবার তারা এলাকায় ফিরে এসেছে। ক্যাডাররা কেউ কেউ আগের মতোই মোটরসাইকেলে ধোঁয়া তুলে, টানা হর্ন বাজিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। তাদের হুমকি-ধমকি, চাঁদাবাজি সবই চলছে বহাল তবিয়তে। তবে পাপিয়ার মাদক বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক হিসেবে চিহ্নিত ২০ সদস্যের কাউকে এখনো এলাকায় দেখতে পাচ্ছেন না বাসিন্দারা। তারা আত্মগোপনে থাকলেও রমরমাভাবেই চলছে তাদের মাদক সাম্রাজ্য। নরসিংদীর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বেশ কিছু নেতা-কর্মী এবং পরিবহন শ্রমিকদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা অপরাধী চক্রের সদস্যরা ‘কে.এম.সি’ লেখা ট্যাটু ব্যবহার করেন। পাপিয়া নিজের হাতে ট্যাটু আঁকতেন। কেএমসি বাহিনী জেলার সর্বত্র মাদক, টেন্ডার, অস্ত্রবাজি, জমি দখল আর চাঁদাবাজি চালায়। তাদের অপরাধ তৎপরতায় ব্যবহারের জন্য পাঁচটি মোটরসাইকেল, একটি মাইক্রো ও একটি জিপও কিনে দেন পাপিয়া। এ বাহিনীর তত্ত্বাবধানে মাঝে মাঝেই ডিজে পার্টির নামে চলত মাদক-নারীর রমরমা বাণিজ্য। কেএমসি সদস্যদের নিয়ে নরসিংদীতে মিছিল-মিটিংয়ে বিশাল শোডাউনও দিতেন পাপিয়া। যুব মহিলা লীগের নেত্রী হিসেবে শুধু ক্ষমতাসীন দলের এমপি-নেতাদের সঙ্গেই নয়, পাপিয়ার অন্ধকার জগতের ঘনিষ্ঠতায় জড়িয়ে ছিলেন বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা, এমপি, ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরাও। তার মাধ্যমে বিভিন্ন টেন্ডার কাজ বাগিয়ে নিতে পাপিয়ার ডেরায় হাজিরা দিতেন ডাকসাইটে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররাও। রেলওয়ে, এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ, পিডিবিসহ বেশ কয়েকটি সংস্থার কয়েকশ কোটি টাকার টেন্ডারে পাপিয়ার সরাসরি হস্তক্ষেপ ও প্রভাব খাটিয়ে কাজ বাগিয়ে নেওয়ারও তথ্য পাওয়া গেছে।

আরো পড়তে পারেন:  হাফতার বাহিনীকে উৎখাত, ত্রিপলি দখল লিবীয় সরকারের

কলেজ হোস্টেলেই ছিল ‘পাপের আস্তানা’ : নরসিংদী সরকারি কলেজে লেখাপড়ার সময় ছাত্রী হোস্টেলে ‘পাপের আস্তানা’ গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই পাপিয়ার অপরাধ জগতে হাতেখড়ি। স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০০৬ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজে প্রথম ছাত্রী হোস্টেল উদ্বোধনের পরই হোস্টেলের ১১ নম্বর কক্ষটিতে নিজের আস্তানা বানিয়েছিলেন পাপিয়া। সেখানে অনেক বহিরাগত মেয়েদের আনাগোনা ছিল এবং কলেজের অনেক ছাত্রীকেও নানা প্রলোভন দিয়ে অনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত করেছিলেন তিনি। পাপিয়ার ওই সময়ের প্রেমিক মতি সুমনের মাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও ধনাঢ্যদের কাছে তরুণীদের পাঠাতেন। বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে নরসিংদীর স্থানীয় অনেক রাজনৈতিক নেতাও পাপিয়াকে নানা কাজে ব্যবহার করতেন। সেখান থেকেই শুরু হয় পাপিয়ার বেপরোয়া জীবন। নরসিংদী কলেজ শাখা ছাত্রলীগের তৎকালীন আহ্বায়ক মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমন ওরফে মতি সুমনের সঙ্গে প্রেম শেষে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন পাপিয়া। পাপিয়ার মতো সুমনেরও বেপরোয়া জীবনযাপনের কারণে তার পরিবারের সদস্যরা বিব্রত হতেন। শৈশব থেকেই চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ও ব্ল্যাকমেইল ছিল তার প্রধান হবি। ২০০১ সালে নরসিংদীর ভেলানগরে যাত্রা প্যান্ডেলে পৌর কমিশনার মানিক মিয়াকে হত্যার পর তিনি আলোচনায় আসেন। শহরের প্রতিটি সন্ত্রাস-সংঘাতেই ছিল সুমনের সক্রিয় অংশগ্রহণ। হত্যা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের ওপর ভর করেই নরসিংদীতে উত্থান ঘটে তার। রাজনীতিবিদদের সঙ্গেও গড়ে ওঠে সখ্য। ২০১৩ সালে মতি সুমনের নরসিংদীর বাসায় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় পাপিয়া গুলিবিদ্ধ হন। ওই হামলার পরপরই মূলত মতি সুমন ও পাপিয়া নরসিংদী ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সুবাদে সুমন-পাপিয়া দম্পতি রাজধানীর সাবেক এক এমপির আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। তার সঙ্গেই যৌথ মালিকানায় গড়ে তোলেন গাড়ির ব্যবসা। পাশাপাশি জড়িয়ে পড়েন অনৈতিক সব কর্মকান্ডে। এরপর আর তাদের পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। নরসিংদী জেলা শহরে ভাগদী মারকাজ মসজিদ এলাকার জনৈক সাইফুল বারীর মেয়ে পাপিয়া। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, একটি দোতলা পাকা বাড়ি তার পিতার। একই মহল্লায় একটি পাকা বাড়ি নির্মাণ করে রেখেছেন পাপিয়া। ঢাকা থেকে মাঝে-মধ্যে গিয়ে সেখানেই কিছু সময় কাটাতেন তিনি। পাশেই নির্মিত আরেকটি সেমিপাকা টিনশেড বাড়িকে টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করতেন পাপিয়া-সুমন চক্র।

আরো পড়তে পারেন:  ২৯ জানুয়ারি: টিভিতে আজকের খেলা সূচি

অনেক ঘরেই আতঙ্কের ছায়া : পাপিয়াকান্ডে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জব্দ করা নানা ভিডিও ক্লিপে বহু তরুণীর সর্বনাশের দৃশ্য রয়েছে। তাদের সঙ্গে কারা অনৈতিক মেলামেশা করেছেন তারাও চিহ্নিত রয়েছেন এসব ভিডিও ক্লিপে। এ খবর ছড়িয়ে পড়তেই পাপিয়া-সুমন দম্পতির ব্ল্যাকমেইলের শিকার তরুণীদের পরিবারে নেমে এসেছে ভয়াবহ আতঙ্ক। পাপিয়ার প্রথম ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নরসিংদী সরকারি কলেজ হোস্টেলে বিভিন্ন সময়ে অবস্থানকারী ছাত্রীরা বিব্রত হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। এরপরই নাস্তানাবুদের শিকার হচ্ছেন পাপিয়ার সঙ্গে সাংগঠনিক কর্মকান্ডসহ মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নেওয়া যুব মহিলা লীগের সদস্যরা। সাধারণ মানুষের নানারকম জিজ্ঞাসু দৃষ্টির কবলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন অনেকেই। নিজ নিজ পরিবারেও তারা নানারকম সন্দেহের জালে প্রশ্নবাণে জর্জরিত হচ্ছেন। নরসিংদী শহরের ভাগদী মারকাজ, ভেলানগর, চিনিশপুর, জেলখানা মোড় এলাকার বহু মেয়েকে চাকরি দেওয়ার নাম করে ঢাকার বিভিন্ন হোটেল-বার এবং অনলাইন এসকর্ট বাণিজ্যের নামে পাপিয়া জোরপূর্বক দেহব্যবসায় বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। এসব মেয়ের নানা নগ্ন দৃশ্যাবলি গোপনে ভিডিও রেকর্ডিং করে মাসের পর মাস তাদের ব্ল্যাকমেইল করারও অভিযোগ রয়েছে। নিজের সর্বস্ব হারিয়েও দীর্ঘদিন যারা পাপিয়ার কাছে জিম্মিদশায় আটকে ছিলেন, তারা এখন তদন্তকারী নানা সংস্থার মুখোমুখি হওয়াসহ নিজেদের পরিচয় ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন। অনেক মেয়ে নিজেদের বাড়িঘর ও পড়াশোনা ছেড়ে দূরবর্তী আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গা-ঢাকা দিয়ে এ ঝক্কি থেকে রেহাই পাওয়ার পথ খুঁজছেন। অপরাধ-অপকর্ম : বহুমুখী প্রতারণা : পাপিয়া-সুমনকে গ্রেফতারের পর র‌্যাব-১ অধিনায়ক বলেন, নরসিংদী এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা এবং রাজধানীতে অভিজাত এলাকায় দেহবাণিজ্যসহ নানারকম প্রতারণামূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার পাহাড় বানিয়েছেন তারা। অনৈতিক কার্যকলাপের ভিডিও ধারণ করে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়াই তাদের প্রধান পেশা। পুলিশের এসআই ও বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন পদে মানুষকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিতেন তারা। শুধু তা-ই নয়, জমির দালালি, সিএনজি পাম্পের লাইসেন্স দেওয়া, গ্যাস লাইন সংযোগের নামেও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তারা মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকেও নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ রেখেছেন পাপিয়া-সুমন।

আরো পড়তে পারেন:  ১২ জানুয়ারি: ইতিহাসে আজকের এই দিনে

 

সূত্র: বিডি প্রতিদিন

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

 আরো পড়তে পারেন:  

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *