দুই সপ্তাহ থাকবে তীব্রতা

যতই দিন যাচ্ছে, ততই বাড়ছে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের তীব্রতা। এটি কমপক্ষে এক থেকে দুই সপ্তাহ অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময়ে বাড়বে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় যতদ্রুত সম্ভব ‘লকডাউন (অবরুদ্ধ)’ কার্যকরের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বুধবার দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে যুগান্তরের কাছে উল্লিখিত অভিমত দেন বেশ কয়েকজন ভাইরোলজিস্ট (ভাইরাস বিশেষজ্ঞ) ও এপিডেমিওলজিস্ট (রোগতত্ত্ববিদ)। তারা প্রায় অভিন্ন তথ্য দিয়ে জানান, আগামী দুই সপ্তাহের পর ভাইরাসের তীব্রতা খুবই ধীরে ধীরে কমতে পারে। অর্থাৎ তীব্রতা কমলেও প্রকোপ থেকেই যাবে।

সেক্ষেত্রে সংক্রমণ রোধে চিহ্নিত এলাকায় কার্যকর অর্থেই ‘লকডাউন’ হতে হবে। যেখানে নিশ্চিত করতে হবে-কন্টাক্ট ট্রেসিং (রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিকে অনুসন্ধান), আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেয়া এবং সংশ্লিষ্ট সবার কোয়ারেন্টিন (সঙ্গত্যাগ)-এর ব্যবস্থাসহ স্থানীয়দের জরুরি কাজের চলাফেরায় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ ইত্যাদি।

দেশে ভাইরাসের স্বাভাবিক সংক্রমণ বজায় থাকলে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা এত বাড়ত না-এমন মন্তব্য করে বিশেষজ্ঞদের আরও অভিমত- সংক্রমণের মাঝামাঝি সময়ে সারা দেশে অবাধ চলাচলের সুযোগ করে দেয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শুধু তাই নয়, সরকার ঘোষিত দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা সাধারণ ছুটিতেই লোকজনকে কার্যকর অর্থে বাড়িতে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে ভাইরাসটি ধীরে ধীরে সামাজিক সংক্রমণে রূপ নেয়। এতেই বাড়তে থাকে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর তথ্যমতে, দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার পর ইতোমধ্যে ১০২ দিন অতিবাহিত হয়েছে। বুধবার (১০২তম দিন) চার হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা একদিনে সর্বোচ্চ। দেশে সংক্রমণের শুরু থেকে এ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ৪৮৯ জনে। একই সময়ে দেশে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৩০৫ জনের। আক্রান্ত এবং মৃতের প্রায় অর্ধেক রোগী শনাক্ত হয়েছে চলতি মাসের প্রথম ১৭ দিনে। এই সময়ে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৪৯ হাজার (৪৮ হাজার ৯৫৭) জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৬৩৩ জনের।

আইইডিসিআরের তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রথম ১০০ রোগী শনাক্ত হয় প্রথম ২৮ দিনে, অর্থাৎ ৬ এপ্রিল। পরবর্তী ৮ দিনে (১৪ এপ্রিল) এই সংখ্যা এক হাজারে পৌঁছায়। এর ১৯ দিন পর অর্থাৎ ৩ মে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজারে। এরপর ১৮ মে রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫ হাজারে। গত ১ জুন এই সংখ্যা ৫০ হাজারে পৌঁছায়। আর ১৭ জুন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ৪৮৯ জনে।

আরো পড়তে পারেন:  ডেনমার্কের স্কুলে নামাজ শিক্ষার ভিডিও নিয়ে তুমুল বিতর্ক (ভিডিও)

আরও জানা গেছে, ৫ এপ্রিল পর্যন্ত মৃত্যুর ঘটনা ছিল অনিয়মিত। পরবর্তী সময়ে দেশে করোনায় মৃত্যু যেন প্রতিদিনের একটি স্থায়ী ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এখন পর্যন্ত সরকার করোনাভাইরাস সংক্রমণে ১ হাজার ৩০৫ জনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে চলতি মাসের প্রথম ১৭ দিনে মৃত্যু হয়েছে ৬৩৩ জনের, যা মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক। গত ১৮ মার্চ প্রথম রোগীর মৃত্যু ঘটে।

এরপর ৬ এপ্রিল মৃতের সংখ্যা ছিল ১২ জন, ১৪ এপ্রিল ৪৬ জন, ৩ মে ১৭৭ জন, ১৮ মে ৩৪৯ জন, ১ জুন ৬৭২ জন, ১১ জুন ১০০০ জন এবং ১৭ জুন এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩০৫ জনে।
এর বাইরে রোগী শনাক্তের প্রথম থেকেই প্রতিদিন কোভিড-১৯ উপসর্গ নিয়ে অনেক মানুষের মৃত্যুর খবর আসছে। এ পর্যন্ত অন্তত এক হাজার মানুষ মারা গেছেন উপসর্গ নিয়ে, যাদের বেশিরভাগেরই নমুনা পরীক্ষা করা হয়নি।

ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন (নিপসম)-এর ভাইরোলজিস্ট ডা. মোহাম্মদ জামালউদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভাইরাসের রি-প্রোডাকশন নম্বর না করায় এটি বাড়া-কমার হার সঠিকভাবে বলা কঠিন। ভাইরাসের ট্রান্সমিশন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় থাকলে সেটি বলা সহজ হতো। কিন্তু সংক্রমণ চলাবস্থায় সারা দেশে জনসাধারণের অবাধ যাতায়াতের ফলে সংক্রমণের হার কয়েকগুণ বেড়েছে। তবে ভাইরোলজিক্যাল বিশ্লেষণ করে বলা যায়, বর্তমানে যে হারে সংক্রমণ বাড়ছে, সেটি আগামী এক থেকে দু’সপ্তাহ পরে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে ২১৫ দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে গত এক সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি নতুন রোগী বেড়েছে, এমন দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ১১তম। ওয়ার্ল্ডওমিটারসের তথ্যানুযায়ী, আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে ১৮তম। মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে ৩১তম।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সংক্রমণ ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল সরকার। সারা দেশ কার্যত লকডাউন করা হয়। তবে করোনা সংক্রমণের প্রথম কেন্দ্রস্থল চীনের তুলনায় সেটা ছিল ঢিলেঢালা। গত ২৬ এপ্রিল থেকে পোশাক কারখানা এবং ইফতারি বিক্রির দোকান খুলে দেয়া হয়।

আরো পড়তে পারেন:  এবার যুব মহিলা লীগে শুদ্ধি অভিযানের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

তখন থেকে লকডাউন পরিস্থিতি আরও লাগামছাড়া হতে শুরু করে। এর ঠিক দুই সপ্তাহ পর সংক্রমণের দশম সপ্তাহ (১০-১৬ মে) থেকে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেশে ঢিলেঢালাভাবে সংক্রমণ ঘটতে দেখা গেছে।

এর মধ্যে গত মাসের শেষের দিকে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঈদ উপলক্ষে রাজধানী থেকে সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। কেনাকাটার জন্য দোকানপাট উন্মুক্ত রাখা হয়। ঈদের পর গত ৩১ মে থেকে লকডাউনও উঠিয়ে দেয়া হয়। খুলে দেয়া হয় প্রায় সব অফিস-আদালত। জুনের মাঝামাঝি গিয়ে ঈদের সময়ের ঢিলেঢালা ভাব এবং লকডাউন তুলে দেয়ার প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করে।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন যুগান্তর প্রতিবেদককে বলেন, আমি মনে করি- সংক্রমণ যথেষ্ট ছড়িয়ে পড়েছে। তাই সময়ক্ষেপণ না করে লকডাউন অতিদ্রুত কার্যকর করা দরকার। কারণ, রোগী বাড়ছে, মৃত্যু বাড়ছে-প্রতিটি দিনই উদ্বেগের।

এ প্রসঙ্গে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এসএম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন দেশের কোভিডের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছে আগামী এক থেকে দু’সপ্তাহের মধ্যেই সংক্রমণ কমতে শুরু করবে। তবে এটা প্রাকৃতিকভাবে কমবে না-এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ভাইরাসটির অসংখ্য ‘জিনম সিকোয়েন্সিং (জন্মরহস্য)’ বিশ্লেষণ করে তিনি এমন মত দেন।

ড. আলমগীর আরও বলেন, ভাইরাসটির মিউটেশনের যে কথা বলা হয়, সেটি খুবই ধীরগতির। এটি শুরুতে যে গতিতে সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করেছিল সেই গতিতেই রয়েছে। ঈদের আগে বা পরে ঢাকায় আসা-যাওয়ায় যে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের জন্ম দেয়া হয়েছে, তার প্রতিফল এখন দেখা যাচ্ছে।

তাছাড়া ঈদে বাড়ি গিয়ে বয়স্কদের এই ভাইরাস দিয়ে আসা হয়েছে। ফলে মৃত্যুও বেড়েছে। যেহেতু শনাক্তদের ২৫ শতাংশই উপসর্গহীন তাই তারা না-জেনেই নীরবে ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, এটি নিয়ন্ত্রণে এখন যে কোনো উপায়ে ট্রান্সমিশন বন্ধ করতে হবে। সেটি এলাকাভিত্তিক কিংবা গুচ্ছভিত্তিক হোক।

 

সূত্র: যুগান্তর

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

 আরো পড়তে পারেন:  

আরো পড়তে পারেন:  ২২ জানুয়ারি: ইতিহাসে আজকের এই দিনে
যে ৬ কাজে জান্নাতের জিম্মাদার হবেন বিশ্বনবি
/ ইসলামী-জীবন, সব খবর
Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *