দিল্লির সতর্কবার্তা পেয়ে মুজিব বলেছিলেন, জিয়া-ফারুকরা আমার নিজের ছেলের মতো

 

সেই ৬২ সাল থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও আত্মিকভাবে জড়িয়ে যাওয়া ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর জীবনের অন্যতম ভুল ছিল জেনারেল জিয়াকে বিশ্বাস করে সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ করা ও ৭৩ সালে ওয়াশিংটন সফরে পঠানো। আইএসআইর পরিকল্পনায় জিয়া তার সহকর্মী ফারুক রহমানদের দিয়ে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিলেন। ভারতের ২৮তম স্বাধীনতা দিবস ৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোররাতে যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় তখন রাওয়ালপিন্ডি আইএসআই হেডকোয়ার্টারে উল্লাস চলছিল। আর জিয়া ইউনিফর্ম পরে সেনাসদরে বসেছিলেন। ১০ জুলাই লন্ডনে শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে যে সাক্ষাৎকার দেন তার শেষ পর্ব আজ প্রকাশিত হলো।

শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বলেছেন, ১৯৭৩ সালের বসন্তে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ জেনারেল জিয়াউর রহমান যুক্তরাষ্ট্র সফর করে ঢাকা ফেরার পথে লন্ডনে যাত্রা বিরতি করেছিলেন। আমার কাছে থাকা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিজে গলা বাড়িয়ে তার সঙ্গে একটি বিষয়ে কথোপকথন করেছিলাম। ১৯৭৩ সালের সেই সময়টি ছিল ভীষণ আবেগময়। পাকিস্তান একটি যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল চিরশত্রু ভারতের কাছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার কারণে পাকিস্তানের কাছে শেখ মুজিবুর রহমান নামটি ছিল ঘৃণিত, যদিও তিনি তার জাতিকে স্বাধীন করে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে শুধু জাতির পিতাই নন; জাতির ঐক্যের প্রতীকে এবং বিশ্বে এক জননায়কে পরিণত হন।

পাকিস্তানের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের চোখেও শেখ মুজিবুর রহমান ঘৃণিত ছিলেন। সেই সময় খবর আসছিল, রাওয়ালপিন্ডির হেডকোয়ার্টারে জেনারেলরা হতাশা ও ক্রোধে গোয়েন্দা প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার বিষয়ে। হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে একজন জেনারেলের সামরিক ক্ষমতাগ্রহণ ঘটাতে পারে কিনা, সে বিষয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে। সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা গোপনে একটি জনপ্রিয়তা যাচাই ক্যাম্পেইনও করতে চেয়েছিল। যাতে এই বিশেষ অপারেশনের প্রস্তুতি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। এর মধ্যেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হয়ে উঠেছিল। চারপাশে গরম বাতাস বয়ে চলছিল।

শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বলেন, প্রশ্ন ছিল-ঐসব রিপোর্ট কি বিশ্বাসযোগ্য ছিল? স্বাভাবিকভাবেই কিছুটাতো বটেই, কিন্তু পাকিস্তান এমন এক দেশ যেখানে যে কোনো কিছুই সম্ভব। কিন্তু কমতি যেটা ছিল সেটি হচ্ছে এই রিপোর্টগুলোর যথার্থতা কষ্টি পাথরে যাচাই করার সুযোগ ছিল না। প্রতিরোধে যাওয়ার মতো তথ্য ছিল না, ছিল শুধু রাওয়ালপিন্ডির ঘটনা প্রবাহের টুকরা টুকরা রিপোর্ট। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যাচেষ্টার রিপোর্টটি নয়াদিল্লি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল। বামপন্থিদের মধ্যে ছিল চিলির নেতা সালভাদর আলেন্দেকে হত্যা করার পর সিআইএ এবার শেখ মুজিবকে হত্যা করার দায়িত্ব গ্রহণ করেবে।

এসব গুজব ভারতেও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল।

শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বলেন, বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকার জন্য। লন্ডনে যাত্রা বিরতিকালে জিয়াউর রহমান নিজেই আমাকে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুই তাকে ব্যক্তিগত প্রতিনিধি হিসেবে ওয়াশিংটন সফরে পাঠিয়েছিলেন। দেড় মাসেরও বেশি সময় পেন্টাগন, সিআইএ এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের সঙ্গে জেনারেল জিয়া সম্পর্ক তৈরি করেন। তিনি যখন ঢাকা ফেরার পথে লন্ডনে যাত্রাবিরতি করলেন তখন আমি ভারতীয় হাইকমিশনের অ্যাটাশে হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার তখন সৈয়দ আবদুস সুলতান। তিনি আমাকে জেনারেল জিয়া দেখা করতে আগ্রহী বলে বার্তা পাঠান। নটিংহিল গেটে বাংলাদেশ হাইকমিশন অফিসে যখন সৈয়দ সুলতানের কক্ষে গেলাম, তখন কালো গগলস পরিহিত জিয়া বসে আছেন। আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর সেদিন আমার আতিথ্যে মধ্যাহ্নভোজের মাধ্যমে বৈঠক শেষ হয়।

আমার সঙ্গে তার সাক্ষাৎকারের উদ্দেশ্য ছিল, বঙ্গবন্ধুর খুনি ফারুক রহমানের একটি সুটকেস ও রেজিমেন্ট ব্যাটন ফেরত নেওয়া যেটি আমার কাছে রক্ষিত ছিল। ফারুক রহমান পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে সৌদি সামরিক বাহিনীর ট্রেনিং অফিসার হিসেবে সেখানে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে পাকিস্তান ফিরে যেতে তিনি যখন লন্ডনে এলেন তখন ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, ইয়াহিয়া খানের গণহত্যা ঘটে গেছে। ফারুক রহমানকে আমার তখন একজন আবেগী মানুষ মনে হয়েছিল। গণহত্যার প্রতিবাদে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে মনোনিবেশ করেন। আমার সঙ্গে তখন তার দেখা হয়েছিল। আমি তখন ফারুককে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে বলি। বিচারপতি চৌধুরী তখন লন্ডন থেকে মুক্তির সংগ্রাম পরিচালনা করছিলেন। তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত। এই দীর্ঘ সময় ফারুক লন্ডনেই ছিলেন। ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের রাতে আমার সঙ্গে এসে দেখা করেন ফারুক রহমান। তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ইচ্ছা পোষণ করে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য পাসপোর্টের ব্যবস্থা করে দিতে বলেন। আমি আমার চ্যানেল ব্যবহার করে ভারতীয় সামরিক বাহিনী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং ফারুক রহমানের যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছানোর বিষয়টিতে অনুমোদন চাই। তিনি ভারত-পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিরাপদে রাখার জন্য তার সুটকেস ও রেজিমেন্ট ব্যাটনটি আমার কাছে দেন। তিনি বলেন, যুদ্ধে যদি বেঁচে যান তাহলে কোনো এক সময় নিয়ে যাবেন। আর যদি মৃত্যু হয় তাহলে যেন টেমস নদীতে ভাসিয়ে দিই।

যাক সেই বৈঠকে জিয়াউর রহমানকে প্রশ্ন করলাম, ফারুক রহমান আপনার একজন অধীনস্থ কর্মকর্তা। আপনি কেন তার সুটকেস নিতে এসেছেন? জিয়ার উত্তর ছিল, অধীনস্থ হলেও আমার সঙ্গে ফারুকের সম্পর্ক চমৎকার এবং এটি নিয়ে যেতে অনুরোধ করেছেন। এই সুটকেস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সিরিয়াস আলোচনা করার সুযোগ করে দিয়েছিল। শেখ মুজিবকে হত্যার বিষয়টি নিলামে উঠেছে, ভারতে চলমান এমন একটি গুজব ঠাঁই নিয়েছে আমাদের আলোচনায়। আলোচনার মাঝখানে আমি নিজে বোঝার তাগিদে জিয়াউর রহমানের কাছে একটা বা দুটো অপ্রিয় প্রশ্ন করার অনুমতি চাইলে তিনি রাজি হলেন। প্রথমেই জানতে চাইলাম, বঙ্গবন্ধুর জীবন নিয়ে আমার শঙ্কা ব্যক্তিগত। কারণ আমরা দীর্ঘদিনের পুরনো বন্ধু। জবাবে জিয়া বললেন, হাইকমিশন তাকে বিষয়টি জানিয়েছে। আমি তাকে জবাব দিতে আরামবোধ না করলে দিতে হবে না এই কথা বলে প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম- ৬ সপ্তাহের ওয়াশিংটন সফরে আপনি কার কার সঙ্গে দেখা করেছেন? তিনি জবাবে বললেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ডিফেন্স সেক্রেটারি থেকে নিচের দিকের অনেক সিনিয়র অফিশিয়ালের সঙ্গে দেখা করেছেন। এবার আমি জানতে চাইলাম আপনি যেহেতু পেশাগত জীবন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে শুরু করেছিলেন, পুরনো দিনের কথা ভেবে আপনার নিশ্চয়ই ওয়াশিংটনের পাকিস্তান দূতাবাসের মিলিটারি অ্যাটাশের সঙ্গে দেখা করেছেন?

আরো পড়তে পারেন:  নিয়ম উপেক্ষা করে রাব্বানীকে বিশেষ ক্ষমতায় এমফিলে ভর্তি!

জবাবে জিয়া বললেন, হ্যাঁ, আমাদের দেখা হয়েছিল। আমি কিছুটা নার্ভাসবোধ করলেও সরাসরি আসল বিষয়ে চলে এলাম। জিয়ার কাছে জানতে চাইলাম, উপমহাদেশের রাজনৈতিক আবহাওয়া যখন কালো মেঘে আচ্ছন্ন এবং মুজিব হত্যার সম্ভাব্য তৎপরতা চলছে তখন ৬ সপ্তাহের জন্য দেশের ডেপুটি সেনাপ্রধানকে দেশের বাইরে পাঠানো কি প্রয়োজনহীনভাবে সমস্যা ডেকে আনা নয়? আমি অবশ্য প্রথমেই তাকে বলে নিয়েছিলাম যে আমি একটি তাত্ত্বিক পরিস্থিতির বিচার করছি, ব্যক্তিগত নয়। আমি যখন দেখলাম আমার প্রশ্ন শুনেও জিয়াউর রহমান মনোক্ষুণœ নন, তখন আরও জানতে চাইলাম- তার মতো একজন মানুষ যদি গোয়েন্দা সংস্থার অপারেশনাল প্রধান হন, তবে কি তিনি এই সম্ভাবনা বিচার করবেন না যে; যখন একজন যোগ্য প্রার্থী হাতে আছে তখন ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের বিরক্তি উৎপাদনকারী ঝামেলার ব্যক্তিকে সরিয়ে দেওয়া যায়? চিলির আলেন্দে হত্যা একটি বিষয় ছিল। আর ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসের মিলিটারি অ্যাটাশের সঙ্গে দেখা করা ছিল আরেকটি বিষয়। জিয়া পরিণত কূটনীতিকের মতোই আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন। তিনি বেশ হাসতে হাসতে বললেন, এভাবে ভাবতে পারছি কারণ আমার আসলেই একটা উর্বর মস্তিষ্ক আছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মিটিং শেষ করে দিতে পারতেন। কিন্তু অবাক করে দিয়ে একজন ঠান্ডা মাথার মানুষ হিসেবে তা করেননি। আমি জানতে চাইলাম, একজন উচ্চপদস্থ আর্মি অফিসারের জায়গা থেকে ফারুক রহমানের মতো অধীনস্থ কর্মকর্তার সুটকেস নেওয়ার মতো তুচ্ছ কাজ তিনি কেন করছেন? মনে মনে আমি ভাবলাম, তবে কি তিনি কোনো একটি উপযুক্ত সময়ে বিশাল কোনো অপারেশনে ব্যবহারের জন্য গুঁটিটি তৈরি করেছেন? তবে কি কোনো বৃহত্তর পরিকল্পনা আছে? পাকিস্তানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত, সামরিক একনায়কদের ভূমিতে লালিত হওয়ায় খুব বেশি কি কল্পনা করা হয়ে যায়? যদিও ভাবী তারও হয়তো গোপন কোনো উচ্চাকাক্সক্ষা আছে, সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করার? গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একজন নেতাকে হত্যা করার বিষয়টি এমন একজনের মাথায় আসতেই পারে। পাকিস্তানের মিলিটারি অ্যাটাশের সঙ্গে জিয়ার কী কথা হয়েছিল তা জানতে খুব বেশি কৌতূহল হলেও জিয়া নার্ভাসবোধ করায় কথা বাড়াতে পারিনি। আমাদের সেদিনের মিটিং শেষ হওয়ার পর আমার মনে হয়েছে তিনি একটি দেশের ভিআইপি এবং সে দেশের সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ। আমি পদে তার চেয়ে কয়েক ধাপ নিচে ছিলাম এবং বিদেশি একটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হয়ে আমি যে কথাগুলো বলেছি তাতে একজন সিনিয়র সামরিক অফিসারের আসলে গুলি করে আমাকে মেরে ফেলার মতো উসকানিমূলক।

শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বলেন, প্রথম দফা কথোপকথনের অবাক করার বিষয় ছিল জিয়াউর রহমান ভীষণ ঠান্ডা ছিলেন এবং পরদিন আমাকে দেওয়া মধ্যাহ্নভোজ যেখানে ফারুক রহমানের সুটকেস গ্রহণ করেছিলেন সেটি ক্যান্সেল করেননি। ফারুকের সুটকেস নিয়ে রেস্টুরেন্টের পাশে হাইকমিশন পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছিলেন। আমার জন্য এটি গভীর তাৎপর্যের ছিল। আমার খোঁচাখুচির জবাবে তিনি মুখে স্থির নীরবতা এঁটে রেখেছিলেন। একটি মাত্র কথা নার্ভাস হয়ে বার দুই বলেছিলেন সেটি হচ্ছে, ‘আপনার ঈশ্বর প্রদত্ত উর্বর কল্পনাশক্তি আছে। একটি সুটকেস দিয়ে আপনি আমার সঙ্গে রসালো যুদ্ধখেলা খেললেন; তাই না?’ আমি তার কথায় সায় দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলাম এবং দুজনেই শীতল হাসি নিয়ে বিদায় নিলাম।

দুটি মিটিংয়ের পর জিয়াউর রহমান সম্পর্কে আমার ধারণা হয়েছিল, তিনি চঞ্চল চোখের চতুর একজন মানুষ, যা শেখ মুজিবের নিরাপত্তার প্রশ্নে আমার মতে চিন্তার কারণ। আমি জিয়ার সঙ্গে লন্ডনে সাক্ষাৎকারের বিষয়বস্তু নিয়ে জিয়া-ফারুক রহমানরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনা নিচ্ছে- এমন মতামত দিয়ে দ্রুত দিল্লিতে রিপোর্ট পাঠাই। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী সেটি সতর্কবার্তাসহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পাঠিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু এই বার্তা আমলেই নেননি। বললেন, ‘জিয়াউর রহমান ও ফারুক রহমানেরা আমার নিজের ছেলের মতো। ছেলে কখনো পিতাকে হত্যা করে না। ব্যানার্জি ভীতু লোক। তাই এটি পাঠিয়েছে। আমার বাঙালি কখনো আমাকে হত্যা করতে পারে না।’

শশাঙ্ক এস ব্যনার্জি বলেন, ১৯৭৩ সালে লন্ডনে জিয়ার সঙ্গে আমার আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল কর্নেল ফারুক রহমান। আমি জানি না কেন যে আমার মনের খুব গভীরে এই লোকটা সম্পর্কে এক ধরনের নোংরা মনোভাব তৈরি হয়েছিল যে, জিয়াউর রহমান মুজিব হত্যার জন্য ফারুক রহমানকে ব্যবহার করে কোনো বড় অপারেশনের পরিকল্পনা করেছেন। আর সেই ভয় ভারতের স্বাধীনতা দিবস ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালের কালরাতে সংঘটিত হলো। সেনাবাহিনীর একটি দল বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে হামলা চালিয়ে পরিবার পরিজনসহ বঙ্গবন্ধুকে নিষ্ঠুর, দয়ামায়াহীনভাবে হত্যা করল। সেই সংবাদ যখন আমি শুনলাম তখন অঝোরে কেঁদেছি, একজন মহান দেশপ্রেমিক নেতা ও অতুলনীয় অমায়িক ব্যবহারের বিশাল ব্যক্তির নৃশংস হত্যাকান্ডের কারণে।  আমৃত্যু আমার আক্ষেপ থাকবে, আমি তাকে জানানোর পরও তিনি বিশ্বাস তো করলেনই না, নিজের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করলেন না।

বঙ্গবন্ধুকে যখন হত্যা করা হয় তখন রাওয়ালপিন্ডির আইএসআই হেড কোয়ার্টারে উল্লাস চলছিল। ইন্দিরা গান্ধী মুজিবের জীবনের নিরাপত্তার জন্য ঘাতকের বুলেট থেকে রক্ষা করতে ৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন লন্ডন থেকে দিল্লি তারপর ঢাকা যাওয়ার পথে এয়ার ইন্ডিয়ার বদলে ব্রিটিশ রয়েল এয়ার ক্রাফটের ভিআইপি মিলিটারি জেটের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু সেই বুলেট ৩ বছর ৮ মাস পর ভারতের ২৮তম স্বাধীনতা দিবসে আঘাত করে। ধানমন্ডির ৩২ নম্ব^র বাড়িতে ১৫ আগস্টের ভোর রাতে একদল সেনাসদস্য যুদ্ধ ট্যাঙ্ক নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ওপর হিংস্র হামলা চালায়। তখন সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান সম্পূর্ণ ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় ঢাকা সেনানিবাসের কমান্ড সেন্টারে বসে আছেন। তিনি দ্রুত তার শক্তি খাটিয়ে ৭৫-এর নভেম্ব^রেই সামরিক একনায়ক হিসেবে বাংলাদেশের ক্ষমতা গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে ৭২ এর সংবিধান যেটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সেই সংবিধানকে হত্যা করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ধর্মান্ধ ইসলামপন্থি রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব ঘটানো হয়েছিল। এমনকি ভারতবিরোধী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোও নিরাপদ স্বর্গরাজ্য হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করার সুযোগ পেল! বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর মুজিব-পরবর্তী স্তরের চার নেতাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাতের অন্ধকারেই গুলি করে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের সময় তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান।

শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের কথা বলতে বলতে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। বলেন, অবাক হয়ে ভাবী যে মহান নেতা তার মাতৃভূমি ও তার জনগণকে জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবেসেছিলেন; সেই মাটির সন্তানদেরই তার হত্যাকান্ডে ব্যবহার করল একাত্তরের পরাজিত শক্তি। আর স্বাধীন বাংলাদেশকেই এতিম করেনি, বিশ্ব একজন মহান নেতাকেও হারাল!

সূত্র: বিডি প্রতিদিন

দেশের আরো প্রতি মূর্হর্তের খবর জানুন এখানে

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

আরো পড়তে পারেন:  ট্রাম্পের গতিবিধিকে নজরে রাখতে হোয়াইট হাউজের কাছে ‘স্টিনগ্রে ডিভাইস’ বসিয়েছিল ইসরাইল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *