তুরস্ক-ফ্রান্সের বাকযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বাকস্বাধীনতা

 

ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেক্যুলারিজমের তুর্কি শব্দ হচ্ছে লাইকলিক (Laiklik). তুরস্ক ভাষায় শব্দটি এসেছে ফরাসি শব্দ লাইসিটি  (laïcité) থেকে।  বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক যখন আধুনিক তুরস্কের গোড়াপত্তন করার সময় বড় দুটি পরিবর্তন নিয়ে আসেন।

প্রথমটি হল, তুর্কি ভাষায় আরবি অক্ষরের পরিবর্তে লাতিন অক্ষরের ব্যবহার।  সে সময় তুর্কি ভাষায় প্রচুর ফরাসি শব্দ ঢুকানো হয়।

দ্বিতীয়ত, ফ্রান্স ধাঁচের ধর্মনিরপেক্ষতা।  যা মূলত ইসলাম বিরোধিতায় রূপ নিয়েছিল।  ফ্রান্স ধাঁচের লাইসিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য ধাঁচের সেক্যুলারিজম থেকে ভিন্ন।

গত একশ বছর ধরে ফ্রান্স এবং তুরস্ক এই ধর্মনিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রের অপছন্দনীয় জাতি বা গোষ্ঠীকে শায়েস্তা করেছে।  লাইসিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার মূল নীতিকথা গির্জা থেকে রাষ্ট্রকে আলাদা করা বা রাষ্ট্রের ওপর গির্জার ক্ষমতাকে খর্ব করা হলেও ধর্মনিরপেক্ষতাকে ব্যবহার করে ইসলাম এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী মুসলমানদেরকে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হয়েছে বছরের পর বছর।

সে সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাক স্বাধীনতা নামের আরেক ধাপ্পাবাজি। একদিকে লাইসিজম-এর নামে মুসলমানদের নিপীড়ন অন্যদিকে বাক স্বাধীনতার নামে ইসলামী মূল্যবোধের একেবারে গভীরে আঘাত করা।

কোন একজন বব্যক্তি, ছোট একটি গোষ্ঠী বা কিছু লোকের কাজ কর্ম বা আচরণের কারণে ওই লোকগুলো যে ধর্ম ও বিশ্বাসে আছে সেই পুরো ধর্মটাকেই আঘাত করা বিকৃত মানসিকতারই পরিচয়।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের ইসলাম নিয়ে কটূক্তি 

মহানবীকে নিয়ে কটূক্তি করা, ব্যাঙ্গ কার্টুন করা, ইসলামের কটূক্তি বা নিন্দা ফ্রান্সে নতুন নয়।  বাকস্বাধীনতা আর ধর্ম নিরপেক্ষতার বরাত দিয়ে দেশটির বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন এবং রাজনীতিবিদরা এই বিদ্বেষ ছড়ান।

আমি ফ্রান্সের ব্যঙ্গাত্মক সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘শার্লি হেবদো’-তে মহানবীর (স.) ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশকেও যেমন সমর্থন করি না, তেমনি ইসলামের নামে চার্লি হেব্দো-তে সন্ত্রাসী হামলারও নিন্দা করি।

কিন্তু একজন দেশনায়ক তো সাধারণ কোন ম্যাগাজিনের সাংবাদিক বা ছোটখাটো রাজনীতিবিদ নন।  তাই তার বক্তব্যের রেশ ছড়িয়ে পরে অনেক দূর। তার কথার প্রতিধ্বনি পৌঁছে বিশ্বের প্রতিটি কোণে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ গত কয়েক মাস ধরেই ইসলামকে এবং মুসলমানদের অনুভূতিতে কথার মার প্যাঁচে আঘাত করে যাচ্ছেন। যতই দিন যাচ্ছিল তার এই আঘাতের ডোজটা একটু একটু বাড়াচ্ছিলেন। দেখছিলেন যে মুসলিম বিশ্ব থেকে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া আসে। তেমন বড় ধরনের কোনো প্রতিক্রিয়া না আসায় এ মাসের গোঁড়ার দিকে তিনি একেবারে লাগাম ছেড়ে বলে দিলেন, ‘ইসলাম এমন একটি ধর্ম যা আজ সারা বিশ্ব জুড়েই সঙ্কটের মধ্যে আছে।’

আরো পড়তে পারেন:  ছয় কারণে ভারতের প্রতি চড়াও চীন

ইসলাম শুদ্ধিকরণের গুরু দায়িত্বটা তিনি নিজ কাঁধে নিয়ে নিলেন!

মুসলিম দেশের বড় বড় নেতারা ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের ‘আখেরাতের নাজাতের’ কাজে ব্যস্ত রইলেন। কাতার ছাড়া কারও মুখ থেকে টু শব্দটি পর্যন্ত বের হল না। কেউ সাহস করে বললেন না যে, ‘মাক্রোঁ, তুমি তোমার দেশের যে শতকরা ৯ শতাংশ মুসলমান জনগোষ্ঠী আছে তাদের নিয়ে কথা বল। সারা বিশ্বে ইসলাম সঙ্কটে আছে নাকি এর সংস্কার দরকার তা নিয়ে তোমার মাথা না ঘামালেও চলবে।’

 

ফ্রান্সের এবং ইউরোপের আনেক গণমাধ্যমও বরাবরের মত এবারও বাক স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে মাক্রোঁকে সমর্থন দিল।  কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল তুরস্ক। আঙ্কারা তৎক্ষণাৎ এর নিন্দা জানালো। মাক্রোঁকে এই আচরণ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানালো।

কিন্তু তুরস্কের কথা শোনে কে? তুরস্কের এমনিতেই, লিবিয়া, সিরিয়া আর ভূমধ্যসাগর নিয়ে ফ্রান্সের সঙ্গে সাপে-নেউলে অবস্থা। সুতরাং তুরস্ক গায়ের ঝাল একটু ঝাড়তেই পারে ফ্রান্সের ওপর।

কিন্তু মাক্রোঁ-র সেই বক্তব্যের প্রায় তিন সপ্তাহ পরে এসে  তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এ কী করলেন!  রিসেপ তায়িপ এরদোগান ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকে ‘মেন্টাল’ বললেন! বললেন, তার মানসিক চিকিৎসা নেওয়া দরকার!

সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা বলি বলি করেও যে কথাটা বলতে পারেনি, তাদের সেই মনের কথাটাই যেন তিনি বলে ফেললেন ফরাসি নেতার বিরুদ্ধে! কিন্তু তিনি কি জানেন এর প্রতিক্রিয়া কত নিষ্ঠুর হতে পারে ?

কারণ তিনি তো তুরস্কের নেতা। তিনি মুসলমান। পশ্চিমা ওই বাক স্বাধীনতার নীতি তার ক্ষেত্রে চলবে না, চলতে পারে না! সুতরাং মাক্রোঁ-কে মানসিক চিকিৎসা নেওয়ার কথা বলে তুর্কি এই মুসলিম নেতা মস্তবড় ভুল করে ফেললেন! ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকে এতবড়  অপবাদ!

তুর্কি প্রেসিডেন্ট তার বাক স্বাধীনতা ব্যাবহার করে এরকম কিছু বলতেই পারেন। কিন্তু না, তা চলবে না। ইসলাম বিদেশিরাই শুধু বাক স্বাধীনতার অন্তরালে যাকে ইচ্ছা যে রকম ইচ্ছা অপমান, বেইজ্জতি করতে পারবেন! অন্য কেউ তিরস্কার করার স্বাধীনতাটুকুও পাবেন না!

এরদোগানের ওই মন্তব্যকে নিন্দা জানিয়েছে ফরাসি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়। এমনকি তুরস্ক থেকে তার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে নিয়ে গেছে।

আপত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে বিষয়টি আরও বড় আকার ধারণ করবে। দু’দেশের বিরোধে আরও বাড়বে।

আরো পড়তে পারেন:  বাড়ছে না ছুটি, ঢাকার সামনে কী অপেক্ষা করছে?

এই দ্বন্দ্বে কার কী লাভ ? 

যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়া আর জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মারকেলের ক্ষমতা ছাড়ার ঘোষণার পর থেকেই আঞ্চলিক এই জোটটি এখন নেতৃত্ব শূন্যতায় ভুগছে। আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক কোনো বিষয়েই ঐক্যবদ্ধ কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছেনা।

মাক্রোঁ নেতৃত্বহীনতার এই সংকটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বভার স্বেচ্ছায় গ্রহণ করতে চাচ্ছেন। এজন্য তাকে আপসহীন, শক্তিশালী নেতার ভূমিকায় উপস্থাপন করতে হবে। কারণ, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো এখনও তার নেতৃত্ব নিয়ে সন্দিহান। তাই মাক্রোঁ হয়ত নিজেকে আরেকটু ফোকাসে নিয়ে আসতে চাচ্ছেন। এ জন্য মোক্ষম তুরস্ক হল মোক্ষম সুযোগ। তুরস্কের বিরুদ্ধে গেলেই পঙ্গপালের মত সবাই তার পক্ষ হয়ে কথা বলবে। পশ্চিমা বিশ্বে তুরস্কের বিরুদ্ধে এমন একটা মনোভাব ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। সত্য, মিথ্যা যাই হোক  তুরস্ক এবং এরদোগানের বিরুদ্ধে ইনিয়ে বিনিয়ে লিখেন বা বলেন আপনি হিট হয়ে যাবেন।

একারণেই হয়ত মাক্রোঁ নাগরনো-কারাবাখ নিয়ে, লিবিয়া নিয়ে, সিরিয়া নিয়ে এমনকি পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল নিয়েও তুরস্ক বিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন। অবশ্য আরও অনেক অভ্যান্তরীন রাজনৈতিক এবং অন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক হিসাব নিকাশ তো আছেই।

অন্যদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান কেন মাক্রোঁকে তিন সপ্তাহ পরে আক্রমণ করলেন? মাক্রোঁ-র কথার উত্তর যদি দিবেনই তাহলে কেন তাৎক্ষণিক না দিয়ে তিন সপ্তাহ অপেক্ষা করলেন। এরদোগানেরও অবশ্যই রাজনৈতিক হিসাব নিকাশ আছে।

সৌদি আরব, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল যাচ্ছে না তুরস্কের। এই মুহূর্তে মুসলিম বিশ্বকে নিজের পক্ষে আনার জন্য মাক্রোঁর ইসলামী বিদ্বেষী বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করার এই মোক্ষম সুযোগটি হাতছাড়া করার পাত্র তো এরদোগান নন।

তাছাড়া, মাক্রোঁকে আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত করে তার ইইউ জোটের নেতৃত্ব দেবার যে বাসনা, সেখানে কিছুটা হলেও  চিড় ধরাতে পারেন। মুসলিম বিশ্বে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত একজন নেতাকে অনেক ইইউভুক্ত দেশই এই জোটের নেতৃত্বে দেখতে চাইবে না। ইতিমধ্যে, জার্মানি, বুলগেরিয়া, ইতালি মাক্রোঁর অনেক নীতির বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছে।

এছাড়া এতদিন ধরে আজারবাইজান-আর্মেনিয়া সঙ্কট, সিরিয়া, লিবিয়া এবং ভূমধ্যসাগর নিয়ে মাক্রোঁ যেভাবে অনবরত এরদোগানকে আক্রমণ করে যাচ্ছিলেন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এই বক্তব্যের মাধ্যমে তার একটা উচিত জবাব দিলেন।

আরো পড়তে পারেন:  জ্যন্ত অক্টোপাস খেতে গিয়ে নিজেই আক্রমণের শিকার তরুণী

তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুধু বড় বড় বুলি আউরিয়ে নয় বরং কূটনীতিক কলা-কৌশল দিয়ে খেলতে হয়।

লেখক: সরয়ার আলম, চিফ রিপোর্টার, আঞ্চলিক প্রধান, আনাদলু এজেন্সি, তুরস্ক , সূত্র: যুগান্তর

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

 আরো পড়তে পারেন:  

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *