তুরস্ক ও মিশরের মধ্যে চরম উত্তেজনা, বেঁধে যেতে পারে যুদ্ধ

লিবিয়া নিয়ে তুরস্ক ও মিশরের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা চলছে। এই উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত কয়েক সপ্তাহ আগেও লিবিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি ভিন্ন ছিলো। তবে ত্রিপোলির উপকণ্ঠ থেকে হাফতার বাহিনীকে সরিয়ে দেয় দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনী। এরপরই পুরো দৃশ্যপট বদলে যায় সেখানে। সরকারি সেনাদের ওই সাফল্যের মূল কারিগর হচ্ছে তুরস্ক। লিবিয়ায় তুরস্কের এই সাফল্যে উদ্বিগ্ন সৌদি ও আরব আমিরাতের মিত্র দেশ মিশর। সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ থেকে এটি সহজেই অনুমান করা যায়।

কয়েক বছর ধরেই লিবিয়ায় প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে আসলেও এবার দেশটিতে সরাসরি সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মিশর। এরইমধ্যে প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাহ আল সিসির এই সিদ্ধান্তে সম্মতি জানিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্ট। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সির্তে শহর ও আল জুফরা এয়ারবেস ঘিরে পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে যেকোনো সময় দেশটিতে সেনাবাহিনী পাঠিতে পারে মিশরের স্বৈরশাসক সিসি। যদি এমনটা ঘটে তবে তুরস্কের কাছে সামরিক সংশ্লিষ্টতা বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। ফলে লিবিয়ায় সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে মিশর এবং তুরস্কের মধ্যে।

লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে জড়িত দুই পক্ষের কাছেই শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সমর্থন রয়েছে। তুরস্ক, ইতালি ও কাতার জাতিসংঘ স্বীকৃত জিএনএ সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে। অন্যদিকে জেনারেল হাফতারের লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মিকে (এলএনএ) সমর্থন দিচ্ছে রাশিয়া, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ফ্রান্স। তবে জেনারেল হাফতারকে সমর্থন দেয়ার কথা বরাবরই অস্বীকার করে আসছে ফরাসি সরকার।

গত বছরের এপ্রিল থেকে ত্রিপলি দখলের জন্য অভিযান চালিয়ে আসছে এলএনএ। হাফতারের লাগাতার আক্রমণে কোণঠাসা জিএনএ সরকারের সঙ্গে ২০১৯ সালে একটি সামরিক চুক্তি করে তুরস্ক। এরপরই ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে লিবিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপট। সেখানে সামরিক উপদেষ্টা পাঠায় তুরস্ক। তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ড্রোন পিছু হটতে বাধ্য করে হাফতারের সেনাদের। গত জুনে অবশেষে ত্রিপোলির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় জিএনএ বাহিনী। শহরের উপকণ্ঠ থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয় জেনারেল হাফতার। এরপর পাল্টা আক্রমণ শুরু করে সরকারি বাহিনী। এতে গুরুত্বপূর্ণ আল ওয়াতিয়া এয়ারবেসসহ পশ্চিম লিবিয়ার বেশিরভাগ এলাকা দখলে নেয় তারা।

হাফতারের এই পিছু হটার ফলে হতাশার মধ্যে পড়ে গেছে তাকে সমর্থন দিয়ে আসা দেশগুলো। জিএনএ সরকারকে দেয়া সমর্থন প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি করছে তুরস্ক। যতক্ষণ পর্যন্ত আরো বেশি এলাকা পুনর্দখলের মধ্যমে পূর্ব লিবিয়ায় হাফতারের ক্ষমতা নড়বড়ে না হয় ততক্ষণ এই ধারা অব্যাহত রাখবে দেশটি।

গত ৫ জুন, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান এক টুইটার পোস্টে ঘোষণা দেন যে, জিএনএর পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে দেশটির সবচেয়ে বড় এয়ারবেস আল জুফরা ও ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় কৌশলগত শহর সির্তে। এর আগে গত মে মাসে রাশিয়া দীর্ঘ অবরোধ থেকে পিছু হটা ও আল ওয়াতিয়া এয়ারবেসের দখল হারানোর পর লিবিয়ায় ১৪টি মিগ-২৯ এবং সু-২৪ ফেন্সার যুদ্ধবিমানের একটি বহর আল জুফরা এয়ারবেসে মোতায়েন করে । তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এলএনএর পক্ষে লিবিয়ায় যুদ্ধ বিমান মোতায়েনের কথা অস্বীকার করে আসছে রাশিয়া। ফলে সহজেই অনুমান করা যায় যে, এয়ারবেসটিতে তুর্কি সমর্থিত সেনারা হামলা চালিয়ে দখল করে নিলে কিংবা বিমানগুলো ধ্বংস হলে সরাসরি পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবে না রাশিয়া।

আরো পড়তে পারেন:  নতুন ব্যাংক নোট: চাইলেই কি ইচ্ছে মতো টাকা ছাপানো যায়?

এই পরিস্থিতির মধ্যে শঙ্কার মধ্যে রয়েছে লিবিয়ার প্রতিবেশী দেশ মিশর। ফলে দেশটিতে সরাসরি সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এদিকে গত ৪ জুলাই, আল ওয়াতিয়া এয়ারবেসে অজ্ঞাত বিমান থেকে হামলা চালানো হয়। এয়ারবেসটি পুনর্দখলে নেয়ার পর সেখানে এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম মোতায়েন শুরু করেছে তুরস্ক। ধারণা করা হচ্ছে, তুর্কি এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকে লক্ষ্যবস্তু করেই ওই হামলাটি চালানো হয়েছিলো। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রান্সের তৈরি ডাসল্ট রাফাল বিমান থেকে এ হামলা চালানো হয়েছিলো। আর এ থেকে ধারনা করা হয় যে, মিশরই হামলাটি চালিয়েছে। তবে সত্যিই যদি মিশর ওই হামলা চালিয়ে থাকে তবে বুঝা যায় যে, লিবিয়ায় নিজেদের স্বার্থ রক্ষা কতটা গুরুত্বপুর্ণ সিসির কাছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সরকারি বাহিনীর অগ্রগতি থামাতে যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণে পিছপা হবেন না তিনি।

লিবিয়ায় এই মুহূর্তে তুরস্কের বেশ কিছু মাঝারি পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নিজেদের তৈরি বায়রাতকার টিবি-২ ড্রোন এবং কিছু সামরিক উপদেষ্টা মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া সিরিয়া থেকে কিছু বিদ্রোহীকেও লিবিয়ায় পাঠিয়েছে তুরস্ক যারা সরকারি বাহিনীর পক্ষে সরাসরি যুদ্ধ করছে।

মিশর যদি লিবিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে তবে নিশ্চিতভাবেই পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। তুরস্ক যদি বড় কোনো পদক্ষেপ না নেয় তবে
সরকারি সেনাদের আক্রমণাত্মক অবস্থান বদলে রক্ষণাত্মক কৌশলে চলে যেতে হবে। এরইমধ্যে লিবিয়ায় নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে তুরস্ক। উদাহরণস্বরূপ, গত জুন মাসে ভূমধ্যসাগরে লিবিয়ার নৌ সীমানায় এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের অনুশীলন চালিয়েছে তুর্কি বিমানবাহিনী। এছাড়া তুর্কি গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেটের বহর ত্রিপোলির আকাশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। গত এপ্রিলে এই বহরের একটি ফ্রিগেট থেকে এলএনএ বাহিনীর ড্রোন লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। তবে তুরস্ক যদি নিজ দেশের এয়ারবেস থেকে লিবিয়ায় এফ-১৬ যুদ্ধ বিমান ব্যবহার করতে চায় তবে খুব একটা সুবিধা পাবে না। কারণ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসে যুদ্ধক্ষেত্রে বেশিক্ষণ লড়াই করতে পারবে না বিমানগুলো। তাদের আবার ফিরেও যেতে হবে লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে। এছাড়া লিবিয়ার প্রতিবেশী দেশ আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়াও তাদের ঘাটি ব্যবহার করতে তুরস্কের আবেদনে সাড়া দেয়নি।

আরো পড়তে পারেন:  চীন-ভারত: সামরিক শক্তিতে কে কতটা এগিয়ে

জানা গেছে, মিশরের এই ধরণের কোনো সমস্যা নাই। প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় তারা স্বাভাবিকভাবেই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। আর তাই বিমান বাহিনীর ডগফাইটে সমানে সমানে লড়াইয়ের জন্য লিবিয়ার বিমান ঘাটিতেই এফ-১৬ মোতায়েন করতে হবে তুরস্কের। আর সেটা যদি তুরস্ক করে তবে ন্যাটোভুক্ত দেশটির জন্য সেটি একটি বিরাট সিদ্ধান্ত হবে।

মিশরের স্বৈরশাসক সিসি আগেই সির্তে এবং আল জুফরা এয়ার বেসকে ‘রেডলাইন’ বলে রেখেছেন। এখন সরকারি বাহিনী হামলা শুরু করলে মিশর যদি সেনা পাঠায় তবে বড় ধরণের সংঘর্ষে জড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে তুরস্ক ও মিশরের মধ্যে। সেক্ষেত্রে সিরিয়ার থেকেও কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে তুর্কিদের। কারণ গ্লোবাল মিলিটারি র‍্যাংকিং অনুযায়ী, তুরস্কের চেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী এখন মিশরের। র‍্যাংকিংয়ে তাদের অবস্থান নবম আর তুরস্কের এগারো।

তুরস্ক ও মিশর এই দুই দেশই সরাসরি যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানে। তাই এই পথে না হেটে ভিন্ন কোনো পথ খুঁজছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

লিবিয়ার গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপট-

২০১১ সালে ন্যাটো সমর্থিত বিদ্রোহীরা লিবিয়ার ৪১ বছরের স্বৈরশাসক কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে হত্যা করে। এরপর থেকেই দেশটিতে অস্থিরতা বিরাজ করছে।

২০১৪ সালে ত্রিপোলিভিত্তিক সরকারের সঙ্গে বড় ধরণের সংঘাত শুরু হয় পূর্বাঞ্চলের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণে নেয়া মেজর জেনারেল খলিফা হাফতাতের। তবে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দিয়েছে ফায়াজ আল-সারাজের জিএনএ সরকারকে।

জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী, লিবিয়াতে কোনো সেনা মোতায়েন ও অস্ত্র পাঠানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে দেশটির দুই পক্ষের কেউই সেটি মানছে না।

গত বছরের এপ্রিল থেকে ত্রিপোলি দখলের জন্য অভিযান চালিয়ে আসছে এলএনএ। হাফতার বাহিনীর লাগাতার আক্রমণে কোণঠাসা জিএনএ সরকারের সঙ্গে ২০১৯ সালে একটি সামরিক চুক্তি করে তুরস্ক। ওই বছরের জানুয়ারি মাসেই লিবিয়ায় সেনা মোতায়েন করে আঙ্কারা।

গত মে মাসে জাতিসংঘের একটি রিপোর্ট ফাঁস হয়ে যায়। সেখানে বলা হয়, ইয়েভগেনি প্রিগোঝিন পরিচালিত রাশিয়ার ওয়াগনার গ্রুপ থেকে কয়েকশ সেনা লিবিয়ায় জেনারেল হাফতারের সমর্থনে যুদ্ধ করছে। আরো বলা হয় যে, প্রেসিডেন্ট পুতিনের একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইয়েভগেনি প্রিগোঝিন।

তবে সম্প্রতি ত্রিপোলি থেকে ব্যর্থ হয়ে হাফতারের পিছু হটার মধ্যে খবর প্রকাশিত হয় যে, ওয়াগনার গ্রুপের ভাড়াটে সেনারা লিবিয়া ছেড়ে যাচ্ছে। লিবিয়ায় ওয়েগনার গ্রুপের ভাড়াটে সেনাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, তারা যদি লিবিয়া যুদ্ধে জড়িত থাকেও তবে সেখানে রুশ সরকারের কোনো হাত নেই। তারা রাশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করে না বলেও জানান তিনি।

আরো পড়তে পারেন:  যে ১০ খাবারে দূরে থাকবে করোনা

বর্তমানে পশ্চিম লিবিয়ার অধিকাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে দেশটির সরকারি বাহিনী। এখন দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শহর সির্তে পুনরুদ্ধারের জন্য অভিযান চালাচ্ছে তারা। এটি সাবেক স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির জন্মভূমি। এদিকে সির্তে রক্ষার জন্য বিপুল পরিমাণ সেনা মোতায়েন করেছে এলএনএ।

 

সূত্র: ডেইলি বাংলাদেশ

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

 আরো পড়তে পারেন:  

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *