চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে প্রদীপের ৩৫ জনের প্রাইভেট বাহিনী

সেনাবাহিনীর সাবেক অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপের একের পর এক অপকর্ম উঠে আসছে। আইনের পোশাক পরেও অবৈধভাবে এলাকায় পুলিশের বাইরে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব ৩৫ সদস্যের  প্রাইভেট বাহিনী। যাদের কাজ ছিল ওসির নির্দেশে টেকনাফ এলাকায় বিভিন্ন সেক্টর থেকে চাঁদাবাজি, ইয়াবা কারবার পরিচালনা এবং জলদস্যুতা করে টাকা আয়। আরেকটি গ্রুপ ক্রসফায়ার বাণিজ্যে জড়িয়ে গিয়েছিল। তারা কক্সবাজার এলাকায় ইয়াবা ডনদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায় করতো। এই প্রাইভেট বাহিনীর কাছে গোটা এলাকা জিম্মি হয়ে পড়ে। এই বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে যারা কোনোরকম বিরোধে জড়িয়েছেন তাদের অনেকেই প্রদীপের টর্চার সেলে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। অনেকেই প্রাণভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন।

এ পর্যন্ত প্রাইভেট বাহিনীর ১০ জনের নাম পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রদীপ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তারা গাঢাকা দিয়েছে। তাদের ধরতে বিভিন্নস্থানে চালানো হচ্ছে সাঁড়াশি অভিযান। সিনহার যে ভিডিও, মোবাইল ফোন ও টাকা খোয়া গেছে সেগুলো উদ্ধার করার জন্য তৎপর আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরিবারের দাবি, সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর সেগুলো আর পাওয়া যায়নি। র‌্যাব জানিয়েছে, সিনহা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিখুঁতভাবে করা হচ্ছে। দোষীরা যাতে কোনোভাবে ছাড়া না পায় সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি তদন্তে ব্যবহার করা হচ্ছে উচ্চ প্রযুক্তি।

আজ সোমবার থেকে র‌্যাব মামলার মূল ৩ আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করবে। এর আগে র‌্যাবের তদন্তকারী একটি দল সরজমিন সিনহা হত্যাকাণ্ডের মূল জায়গা কক্সবাজারের টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্ট পরিদর্শনে যান। এদিকে, হত্যাকাণ্ডের পর চলচ্চিত্রের একজন খলনায়কের নাম আলোচনায় আসায় তাও খতিয়ে দেখছেন র‌্যাবের তদন্তকারীরা।

হত্যাকাণ্ডের পর আসামি লিয়াকত ও প্রদীপের সঙ্গে এসপি মাসুদের যে কথোপকথন হয়েছে তা আমলে নিয়েছেন তদন্তকারীরা।

এ ছাড়াও র‌্যাব সিনহার সঙ্গে থাকা তার সফরসঙ্গী সিফাতকে আইনগত সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছে। গত ৩১শে জুলাই রাতে কক্সবাজারের টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সিনহা। তিনি তল্লাশিতে বাধা দিয়েছিলেন বলে পুলিশ দাবি করে। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে কক্সবাজার জেলার এসপি বলেন, সিনহা বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন। তার কাছ থেকে ইয়াবা ও পিস্তল পাওয়া গেছে।  সূত্র জানায়, এ ঘটনায় নিহতের বোন শারমিন শাহরিয়ার  ফেরদৌস বাদী হয়ে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমারসহ ৯ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন।

আরো পড়তে পারেন:  ঐতিহাসিক ভাষণটি ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন যিনি

এ বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ গতকাল মানবজমিনকে জানান, ‘আজ সোমবার থেকে মামলার মূল ৩ আসামিকে র‌্যাব জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করবে। পর্যায়ক্রমে অন্যদের করা হবে। সিনহার সঙ্গে থাকা সিফাতকে আইনগত সহযোগিতা দেয়া হবে। তিনি আরো জানান, ইতিমধ্যে তদন্তকারী দল সরজমিন  সেখানকার  লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছে। তারা সেখানে কী তথ্য পেয়েছে তা তদন্তের স্বার্থে বলা যাচ্ছে না।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, প্রদীপের প্রাইভেট বাহিনী ছিল গোটা টেকনাফ এলাকার আতঙ্ক। এই বাহিনীর কয়েকজন সদস্যের নাম হাতে এসেছে তদন্তকারী দলের। সদস্যরা হলো- ফোম কামাল, সাব্বির আহমেদ, তুলা আজিজ, ইয়াবা ডন শাহিন, লাংড়া সোহেল, সাজ্জাদ, মুরগি মিলন, দস্যু রেজাউল, মাঝি রহিম শেখ, গোর্কি কামাল ও শরিফ আহমেদ। তাদের বয়স সবার ২৫ থেকে ৩০-এর মধ্যে। আরো যারা এই প্রাইভেট বাহিনীর সদস্য ছিলেন তাদের সন্ধান চালাচ্ছে র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সূত্র জানায়, প্রদীপ টেকনাফের ওসি হওয়ার পরই আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেই এই প্রাইভেট বাহিনী গড়ে তুলেন। এই বাহিনীর মধ্যে ৩টি ভাগ ছিল। একটি স্থানীয় এলাকায় বড় ইয়াবাকারবারীদের নিয়ন্ত্রণ করতো, আরেক দল বিভিন্ন সেক্টর থেকে চাঁদাবাজি করতো, আরেকটি গ্রুপ জলদস্যুতা করতো।
সূত্র জানায়, যেসব জলদস্যু কক্সবাজারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলো তার মধ্যে ওই বাহিনীর কেউ ছিল না।

সূত্র জানায়, প্রাইভেট বাহিনীর আরেকটি কাজ ছিল ইয়াবা চালানের অন্যতম রুট টেকনাফের ইয়াবা কারবার নিয়ন্ত্রণ করা। পুলিশি কৃতিত্ব দেখানোর জন্য খুচরা ব্যবসায়ীদের ধরা ও ক্রসফায়ারে দিয়েছে প্রদীপ। কিন্তু, বড় কারবারিরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে। তার এই চালাকির কাজ সম্পন্ন করেছে প্রাইভেট বাহিনীর সদস্যরা। এই প্রাইভেট বাহিনীকে আবার প্রদীপ প্রথাগত সোর্স বানিয়েছিল। যারা ওসির নাম করে এলাকায় অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল।

আরো পড়তে পারেন:  ১৮ নভেম্বর: ইতিহাসে আজকের এই দিনে

সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে র‌্যাবের তদন্তকারী দল ঘটনাস্থলে পরিদর্শন করেছেন। তারা আশেপাশের পারপার্শ্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেছেন।  অনেকেই তাদের সঙ্গে আতঙ্কে কথা বলতে রাজি হননি। কিন্তু, মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে অভয় দেয়া হয় যে, তাদের নাম গোপন রাখা হবে।
এবং সঠিক তথ্য দিলে র‌্যাবের পক্ষ থেকে প্রটেকশনের ব্যবস্থা করা হবে। এই সাহসে অনেক প্রত্যক্ষদর্শী র‌্যাবের কাছে ঘটনাস্থলের চিত্র এবং ঘটনার বয়ান দিয়েছেন।

 

সূত্র: মানবজমিন

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

 আরো পড়তে পারেন:  

Loading...
আরো পড়তে পারেন:  বিশ্বব্যাপী মুসলমানেরা টার্গেট কেন, উৎস কোথায়?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *