কোরআনে নারীর যে ১০ বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে

ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তোমরা পরপুরুষের সঙ্গে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়।’ (সূরা: আহজাব, আয়াত: ৩২)।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা- পবিত্র কোরআনুল কারিমের একাধিক জায়গায় নারীদের সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। নারীবাচক বিভিন্ন শব্দ ও গুণাবলির দ্বারা তাদের উল্লেখ করেছেন। যেমন: কন্যা, স্ত্রী, বোন, মা, নারী, যুবতি, মুমিনা, মুসলিমা ইত্যাদি। 

এতে যেমন নারীদের সামগ্রিক আলোচনা এসেছে, তেমনি কয়েকজন মহীয়সী নারীর প্রশংসামূলক বর্ণনাও এসেছে। এসেছে পাপী নারী ও তার পরিণতির কথাও। কোরআনে নারী আলোচনা যেভাবেই আসুক না কেন, তা অবশ্যই মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয়। নিম্নে কোরআনে বর্ণিত নারীর ১০টি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো।

(১) চারিত্রিক পবিত্রতা: অশ্লীলতা, অনৈতিকতা ও অমার্জিত আচার-আচরণ থেকে বেঁচে থাকা। নারী চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষায় আল্লাহ তাদের সংযত চলাফেরা, দৃষ্টি অবনত রাখা ও লজ্জাস্থান হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন নারীকে বলুন, তারা যেন দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে।’ (সূরা: নুর, আয়াত: ৩১)।

আল্লাহ শুধু নারীদের সাধ্বী হওয়ার নির্দেশ দেননি; বরং সাধ্বী নারীর সপ্রশংস উল্লেখও করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘ইমরানের কন্যা মারইয়াম-যে তার লজ্জাস্থান হেফাজত করেছে।’ (সূরা: তাহরিম, আয়াত: ১২)।

(২) লজ্জা ও শালীনতা: লজ্জা ও শালীনতা মানুষের ব্যক্তিত্বের মূল ভিত্তি। নারীর ক্ষেত্রে তা বেশি মূল্য বহন করে। শালীনতা মুমিন নারীর মর্যাদা ও সৌন্দর্যের ভিত্তি, যা তার পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রকাশ পায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ একজন নারীর শালীন আচরণের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘তখন নারীদ্বয়ের একজন লজ্জাজড়িত পায়ে তার কাছে এলো।’ (সূরা: কাসাস, আয়াত: ২৫)।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘… তারা যেন তাদের গোপন আবরণ প্রকাশের জন্য সজোরে পা না ফেলে। হে মুমিনরা! তোমরা সবাই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করো। যেন তোমরা সফল হও।’ (সূরা: নুর, আয়াত: ৩১)।

সুতরাং নারী এমনভাবে চলাফেরা করবে না, যা তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় এবং যা মানুষকে পাপে উদ্বুদ্ব করে।

(৩) স্বামীর আনুগত্য ও আত্মত্যাগ: ইসলামী পারিবারিক ব্যবস্থায় স্বামী পরিবারপ্রধান। পরিবারের ভালো-মন্দ প্রধানত তার ওপর বর্তায়। তাই ইসলাম পারিবারিক শৃঙ্খলা রক্ষার্থে স্ত্রীকে ইসলামী শরীয়ত অনুমোদিত বিষয়ে স্বামীর আনুগত্য করতে এবং সুখে-দুঃখে তার পাশে থেকে সাহস জোগাতে বলেছে। কোরআনে আল্লাহ আইয়ুব (আ.) এর স্ত্রীর প্রশংসা করেছেন—যিনি চরম অসুস্থতা ও দরিদ্রতার মধ্যেও স্বামীর পাশে ছিলেন এবং অসামান্য ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘স্মরণ করো, আমার বান্দা আইয়ুবকে, যখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিল, শয়তান আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে। আমি তাকে বললাম, তুমি তোমার পা দিয়ে ভূমিতে আঘাত করো। এই তো গোসলের সুশীতল পানি ও পানীয়। আমি তাকে দান করেছিলাম তার পরিজনবর্গ ও তাদের মতো আরো, আমার অনুগ্রহস্বরূপ এবং বোধসম্পন্ন মানুষের জন্য উপদেশস্বরূপ।’ (সূরা: সাদ, আয়াত: ৪১-৪৩)।

আরো পড়তে পারেন:  টোলারবাগের করোনাক্রান্ত মৃতের চিকিৎসকের হৃদয়বিদারক লেখা

(৪) ঈর্ষা: আত্মমর্যাদা বোধ মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। নারী-পুরুষ সবার ভেতর তা থাকে। তবে নারীর ভেতর তা আরো প্রবল হয়। যদিও তা অনেক সময় ঈর্ষা ও আত্মচিন্তারূপে প্রকাশ পায় এবং নারীকে ভুল পথে পরিচালিত করে। মহানবী (সা.) এর কয়েকজন স্ত্রী এই প্রবণতার শিকার হলে আল্লাহ তাঁদের সতর্ক করে বলেন, ‘স্মরণ করো- নবী তাঁর স্ত্রীদের একজনকে গোপন একটি কথা বলেছিলেন। অতঃপর যে যখন তা অন্যকে বলে দিল এবং আল্লাহ তা নবীকে জানিয়ে দিলেন, তখন নবী এই ব্যাপারে কিছু ব্যক্ত করলেন এবং কিছু অব্যক্ত রাখলেন। যখন নবী তা সেই স্ত্রীকে জানালেন, তখন সে বলল, আপনাকে এটা কে অবহিত করল। নবী বললেন, আমাকে অবহিত করেছেন তিনি, যিনি সর্বজ্ঞ, সম্যক অবগত।’ (সূরা: তাহরিম, আয়াত: ৩)।

(৫) মার্জিত ভাষা: আল্লাহ কোরআনে নারীদের মার্জিত ভাষা ব্যবহার করতে বলেছেন। যা অস্পষ্টতা, জড়তা ও পাপের ইঙ্গিতবহ হবে না। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা ন্যায়সংগতভাবে কথা বলো।’ (সূরা: আহজাব, আয়াত: ৩২)।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এই আয়াতে ব্যবহৃত ‘কাওলাম-মারুফা’ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘নারীরা অনুচ্চ ভাষায় এমনভাবে কথা বলবে, যা শরীয়ত নিষেধ করেনি এবং মানুষের কাছেও তা শুনতে খারাপ মনে হয় না।’ (তাফসিরে কুরতুবি)।

আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘নারীরা সুন্দর, মার্জিত ও কল্যাণবহ কথা বলবে।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির)।

(৬) জাত্যভিমান: বহু নারী নিজেকে অন্যের তুলনায় শ্রেষ্ঠ ভাবতে পছন্দ করে। এমনকি নিজের ও নিজ পরিবারের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয়। কোরআনে এমন অহঙ্কারের ব্যাপারে নারীকে সতর্ক করা হয়েছে। মহানবী (সা.) জয়নব বিনতে জাহাস (রা.)-কে জায়েদ বিন হারিসা (রা.) এর সঙ্গে বিয়ে দিতে চাইলে তিনি তাতে অসম্মতি প্রকাশ করেন। কেননা তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশের আর জায়েদ (রা.) আগে দাস ছিলেন। এই জাত্যভিমানের ব্যাপারে ইরশাদ হয়, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ বা কোনো মুমিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অমান্য করলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।’ (সূরা: আহজাব, আয়াত: ৩৬)।

আরো পড়তে পারেন:  ১ জানুয়ারি: ইতিহাসে আজকের এই দিনে

(৭) মোহনীয় বাকভঙ্গি: নারীর রূপ, ভঙ্গি ও কথার মোহময়তা সর্বজনবিদিত। রূপের মতো কথার মায়াজালেও সে আটকাতে পারে পুরুষকে। দুর্বল চরিত্রের পুরুষ সহজেই মোহগ্রস্ত হয় তার কথায়। পবিত্র কোরআনে নারীর কথার জাদুময়তার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তোমরা পরপুরুষের সঙ্গে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়।’ (সূরা: আহজাব, আয়াত: ৩২)।

কোরআনের ব্যাখ্যাকারা এই আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, কথার এই কোমলতা ও মোহনীয় ভঙ্গি নারীর বিশেষ গুণ। যা তার স্বামী ও আপনজনের জন্য যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি দুর্বল ঈমানের পুরুষ—যার প্রলুব্ধ হওয়ার ভয় আছে তার সামনে তা প্রকাশ করা নিন্দনীয়। (তাফসিরে ইবনে কাসির ও তাফসিরে তাবারি)।

(৮) জিহ্বার ব্যাধি: ইমাম গাজ্জালি (রহ.) মানুষের জবান বা কথার ১৪টি ব্যাধি উল্লেখ করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে অর্থহীন কথা, পরচর্চা, পরনিন্দা, রুক্ষতা, অশ্লীলতা, ঝগড়া-বিবাদ, অভিশাপ, ঠাট্টা-বিদ্রুপ, উপহাস, গোপনীয়তা প্রকাশ, মিথ্যা কথা ও মিথ্যা আশ্বাস ইত্যাদি। (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, পৃষ্ঠা ১০৪)। এর কোনো কোনোটি নারীর ভেতর বেশি পাওয়া যায়, আবার কোনো কোনোটি পুরুষের ভেতর। তাই আল্লাহ পুরুষের সঙ্গে সঙ্গে নারীকেও এসব ব্যাধির ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘কোনো নারী যেন অপর নারীকে উপহাস না করে। কেননা যাকে উপহাস করা হয়েছে সে উপহাসকারিণীর চেয়ে উত্তম হতে পারে।’ (সূরা: হুজরাত, আয়াত: ১১)।

(৯) দ্বিন পালনে পুরুষের সহযোগী: দ্বীন পালন এবং সমাজে দ্বীন প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় পুরুষের সহযোগী নারী। প্রত্যেক নারী ও পুরুষ নিজ নিজ জায়গা থেকে পরস্পরকে দ্বিনের ব্যাপারে সহযোগিতা করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মুমিন পুরুষ ও নারী পরস্পরের বন্ধু। তারা সত্কাজে আদেশ করে, অসৎ কাজে নিষেধ করে, তারা নামাজ কায়েম করে, জাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। আল্লাহ তাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা: তাওবা, আয়াত: ৭১)।

(১০) পুরুষের মানসিক আশ্রয়: বাহ্যত পুরুষ নারীর অভিভাবক হলেও আল্লাহ নারীকে পুরুষের মানসিক আশ্রয় বানিয়েছেন এবং দাম্পত্য জীবন সুখময় করতে তাদের মধ্যে ভালবাসা ও সহানুভূতি দান করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর নিদর্শন হলো- তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের ভেতর থেকে সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও। তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সূরা: রোম, আয়াত: ২১)।

আরো পড়তে পারেন:  রাস্তায় ছোলা বিক্রি করে কোটিপতি নারীর গল্প

আয়াতে ব্যবহৃত ‘যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও’ বাক্য থেকে পুরুষের জন্য নারীর মানসিক আশ্রয় হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা নারী জাতিকে কোরআনুল কারিমের উক্ত আয়াতগুলোর মর্মার্থ বুঝে জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

সূত্র: ডেইলি বাংলাদেশ

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

 আরো পড়তে পারেন:  

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *