করোনা, মানুষের বিবেক, মনুষ্যত্ব, মূল্যবোধ কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?

হীরেন পণ্ডিত

 

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস, তুমি সমগ্র বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছ। চীনের উহান শহর থেকে শুরু হয়ে বর্তমানে বিশ্বের ২১০টি দেশ ও অঞ্চলে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিয়েছ। আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল লম্বা করে চলেছ। বিশ্বের উন্নত সুপারপাওয়ার দেশ থেকে শুরু করে অত্যন্ত দরিদ্র দেশগুলোকেও এককাতারে নিয়ে এসেছ, সবাইকে অসহায় করে দাঁড় করিয়েছ মৃত্যুর মিছিলে, সবাই তোমার কাছে অসহায়। তোমার বিস্তার, সংক্রমণ ও মৃত্যুর সার্বিক ঘটনা এবং ভবিষ্যতে কী পরিস্থিতি রূপ নেবে, কেউ কিছু বলতে পারছে না। সারা পৃথিবীর মানুষকে ঘরে আটকে রেখে কী সাফল্যই না দেখালে! বাংলাদেশের দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বড় ধরনের এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলে।

তোমার কারণে বিশ্বে আক্রান্ত হয়েছে ২৪ লাখের কাছাকাছি মানুষ। আরো কত মানুষ আক্রান্ত হবে তা বলার উপায় নেই। মৃত্যুর মিছিলে শামিল হয়েছে প্রায় দুই লাখ মানুষ। আরো কত মানুষকে মৃত্যুর মিছিলে শামিল হতে হবে কেউ জানে না। তবে তোমার বিস্তারের কারণে আমরা দেখতে পেয়েছি অনেক মানুষের আসল চেহারা। মানুষ কিভাবে বদলে যায়, মনুষ্যত্ববোধ কিভাবে লোপ পায় এবং হারিয়ে যায়, মানুষ কিভাবে অমানুষ হয়ে যায়, তার জ্বলন্ত উদাহরণ আমরা দেখেছি তোমার কারণে, দেখছি প্রতিনিয়ত।

করোনা, তোমার ভয়ে-আতঙ্কে আমরা অমানবিক হয়ে যাচ্ছি। মরদেহকেও যেন ঘৃণা করছি, আক্রান্ত পরিবারকে ঘৃণা করছি। আক্রান্ত হচ্ছে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি বা সন্দেহজনক ব্যক্তির বাড়িঘর। করোনা রোগীর সত্কার ও জানাজায়ও কেউ যাচ্ছে না ভয়ে। পরিবারের লোকজনও এই আতঙ্কের বাইরে নয়। রাস্তায় অসুস্থ লোকজন পড়ে থাকছে, কেউ কাছেও যাচ্ছে না। স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করলেও সন্দেহ করি আমরা। করোনা আতঙ্ক আমাদের বিবেককে এতটাই নষ্ট করে দিয়েছে। স্বাভাবিক মৃত্যুকেও আলাদা করতে পারছি না। কিন্তু আপনি কিছু না করতে পারলেও তাদের ঘৃণা করবেন না। যথাযথ সুরক্ষা নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে থেকে আপনি করোনা সংক্রমিত মানুষের সঙ্গে কথাও বলতে পারেন।

বাস্তব অবস্থাটাই এমন, আমরা সবাই করোনা আক্রান্ত হতে পারি। করোনা বিশ্বে অদ্ভুত এক অবস্থা সৃষ্টি করেছে। এই ভাইরাস ধনী-গরিব কাউকে পরোয়া করে না, কাউকে বাদ দেয় না। এমপি, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, রাজপুত্র, রানি, রাজা, উজির, প্রজা—কেউই ঝুঁকিমুক্ত নন। আমরাও নই, আপনারাও নন। এই যে এখন আপনি করোনা রোগীকে ঘৃণা করছেন, স্বাস্থ্যসেবায় যাঁরা জড়িত আছেন তাঁদের বাসা ভাড়া দিতে বা এলাকায় না থাকার জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন, তাঁরা কি কাজটি ঠিক করছেন? করোনা আতঙ্ক আমাদের বিবেককে এতটাই নষ্ট করে দিয়েছে, আমাদের মনুষ্যত্বও লোপ পেয়েছে। স্বাভাবিক মৃত্যু আর করোনায় মৃত্যুকেও আলাদা করতে পারছি না।

আরো পড়তে পারেন:  রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী ভিআইপি, বাকিরা রাষ্ট্রের চাকর

এই যে এখন আপনি করোনা রোগীকে ঘৃণা করছেন, কাল যদি আপনি আক্রান্ত হন, তাহলে কী হবে, ভেবেছেন কখনো? করোনা আক্রান্ত রোগীর কিন্তু কোনো অপরাধ নেই। সর্বোচ্চ সাবধানতায় থাকার পরও কিন্তু আপনি করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন।

করোনা, তুমি আমাদের সম্পর্কগুলোকে আরো জটিল করে তুলেছ এরই মধ্যে। স্বামী জ্বর নিয়ে শহর থেকে বাড়ি এসেছেন শুনে স্ত্রী বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। জামাই জ্বর নিয়ে এসেছেন শুনে শ্বশুরবাড়ির লোকজন পালিয়ে যান। করোনা, তুমি যখন চলে যাবে, তারপর এই সম্পর্কগুলো টিকবে কি না তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে আমাদের। এই জামাই কি আর কখনো শ্বশুরবাড়িতে আসবে? করোনা, তোমার কারণে সন্দেহ করে মাকে সন্তানরা জঙ্গলে ফেলে এসেছে। এটা শুধু তোমার জন্য। যে সন্তান সন্দেহের বশে মাকে জঙ্গলে ফেলে রেখে যেতে পারে, সেই সন্তানদের অমানুষ করে তুলেছ তুমি। এদের কি আসলে বেঁচে থাকার দরকার আছে? যুগ যুগ ধরে এই জনপদে আমরা মানবতার কথা বলে আসছি, পারিবারিক বন্ধন নিয়ে গর্ব করছি। তুমি সব মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছ। আজ মনে হচ্ছে, সব ফাঁকা বুলি। ইউরোপ-আমেরিকায় যে লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে, একটা অমানবিক ঘটনার কথাও কিন্তু আমরা শুনিনি। আমাদের কেন তুমি অমানুষ বানিয়ে দিলে, করোনা?

অনেকের ভাবটা এমন, আমি নিজে নিরাপদ থাকি, বাকি সবার কী হবে জানি না। কিন্তু মনে রাখবেন, করোনা এমন এক প্রাণঘাতী ভাইরাস, কেউই কিন্তু ঝুঁকির বাইরে নন। বাঁচতে হলে সবাইকে নিয়েই বাঁচতে হবে। মানুষকে অবশ্যই মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। ঘৃণা না ছড়িয়ে চলুন, আমরা ভালোবাসা ছড়াই।
করোনার ভয়াবহ আতঙ্ক কি আমাদের চিন্তাশক্তিকে এলোমেলো করে দিয়েছে? আমরা সবাই জানি, করোনাভাইরাস বায়ুবাহিত নয় এবং বাতাসে এটি ছড়ায় না। তার পরও উত্তরার দিয়াবাড়ীতে রাজউকের ফ্ল্যাট প্রকল্পে কোয়ারেন্টিন সেন্টার করা যায়নি। তেজগাঁওয়ে হাসপাতাল বানানোর চেষ্টা আমরা পণ্ড করে দিতে চেয়েছি। এ সবই তোমার স্বার্থপরতার জন্য, করোনা। সবার চাওয়া—আমার এলাকায় যেন হাসপাতাল না হয়, কোয়ারেন্টিন সেন্টার না হয়। আমার বাসায় এবং আমার এলাকায় যেন ডাক্তার না থাকে, স্বাস্থ্যকর্মী না থাকে সে চেষ্টাই করি। সব কিছু নিজেকে কেন্দ্র করে। নিজে বাঁচলেই হলো, অন্যের কী হলো তা নিয়ে ভাবার দরকার নেই। কিন্তু এমন তো আমরা কখনো ছিলাম না। করোনা, আমরা তোমার কারণে বড় বেশি স্বার্থপর, বিবেকহীন এবং মনুষ্যত্বহীন হয়ে গেছি।

আরো পড়তে পারেন:  যে কারণে এন্টিবায়োটিক আগের মতো কাজ করছে না

করোনা প্রতিরোধে সামনের সারির যোদ্ধা হলেন চিকিত্সক, নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী, সংবাদকর্মী এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা। অথচ আমাদের দেশে সেই চিকিৎসকসহ সেবাকর্মীরা রয়েছেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়। বিশ্বের অনেক দেশে চিকিত্সক-নার্সসহ সেবাকর্মীদের কাছে মানসম্পন্ন পিপিই-মাস্ক দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। হাসপাতালের পাশে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু আমরা এখনো সেটা করতে পারিনি।

জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভুলে মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যাঁরা যুদ্ধে নেমেছেন, আমাদের সেই সৈনিকদের যথাযথ সম্মান দেখাতে হবে। সেখানে সামনের সারিতে থাকবেন চিকিত্সা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা, যাঁরা রাতদিন নীরবে নিরলস পরিশ্রম করছেন।

বিশ্বব্যাপী মানব সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব ফেলেছে এই করোনা। এ সময় একে অপরকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে হবে, বিবেক নিয়ে কাজ করতে হবে, মনুষ্যত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তাই যাঁরা আমাদের প্রাণ বাঁচাচ্ছেন, তাঁদের নতুন করে চিনতে, জানতে ও সম্মান জানাতে হবে আমাদের। করোনা, তুমি আমাদের বিবেকহীন ও মনুষ্যত্বহীন কোরো না। প্লিজ!

লেখক : প্রাবন্ধিক

 

সূত্র: কালেরকণ্ঠ

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

 আরো পড়তে পারেন:  

Loading...
আরো পড়তে পারেন:  প্রগতি লাইফ কর্তৃক গ্রামীনফোন কর্মকর্তার গ্রুপ বীমা মৃত্যু দাবী’র চেক হস্তান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *