করোনায় হারিয়ে যাওয়া কৈশোর

 

সিলেটের একটি সরকারি বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী তাসলিমা (ছদ্মনাম)। স্বাভাবিক সময়ে স্কুলের ক্লাস ও বাসায় পড়াশোনার ফাঁকে অল্প সময়ের জন্য ঘরের কাজে মাকে সাহায্য করত সে। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর হঠাৎ করে সবকিছু বদলে যায় তার। দীর্ঘায়িত স্কুল ছুটিতে ঘরবন্দি হয়ে পড়ে তাসলিমা। এখন রান্না থেকে শুরু করে ছোট ভাইকে দেখাশোনা, কাপড় ধোয়াসহ গৃহস্থালির প্রায় প্রতিটি কাজেই মায়ের সহযোগী হিসেবে থাকতে হয়েছে তাকে।

ঘরে কাজে সময় বেশি দিতে হলেও আর্থিক সচ্ছলতা থাকায় খাবারের সংকট হয়নি তাসলিমাদের। কিন্তু করোনার কারণে খাবার কম খেতে হয়েছে চট্টগ্রামের কিশোরী পারভিনকে। সে জানায়, করোনার সংক্রমণ শুরু হলে রিকশাচালক বাবার আয় কমে যাওয়ায় পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করতে ব্যাপক সমস্যার মধ্যে পড়তে হয় তাদের। লকডাউনের সময় প্রতি বেলা খাবার জোটেনি তাদের।

শুধু তাসলিমা বা পারভীন নয়, করোনার কারণে বিরূপ প্রভাব পড়েছে দেশের অসংখ্য কিশোর-কিশোরীর শরীর-মন ও পড়াশোনায়। হারিয়ে গেছে জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় সময় কৈশোর। যে সময়টা স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে হেসেখেলে কাটার কথা তা এখন কাটছে ঘরের মধ্যে টেলিভিশন কিংবা মোবাইলের স্ক্রিনে। আবার অনেকেই ঝরে পড়েছে স্কুল থেকে। সংসারের অভাব মেটাতে যুক্ত হয়েছে নানা কাজে।

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন বলছে, কভিড-১৯ দেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থা দুর্বল করার পাশাপাশি অপূরণীয় ক্ষতি করে চলেছে স্কুলের শিক্ষার্থীদের। পরিবারে খাদ্যের অনিরাপত্তা ও উদ্বিগ্নতা মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে।

করোনা মহামারীতে স্কুল থেকে ঝরে পড়া ১০-১৮ বছর বয়সী ২ হাজার ৯৫ শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে ‘অ্যাডোলেসেন্স ইন দ্য টাইম অব কভিড-১৯: এভিডেন্স ফ্রম বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। এতে বলা হয়, স্কুল বন্ধ থাকার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ঘরে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের শেখার জায়গাটি অবারিত নেই। এ কারণে নানা ধরনের মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে এসব কিশোর-কিশোরী। ৯০ শতাংশ কিশোর-কিশোরী তাদের পরিবারের কাছ থেকেই শিক্ষা কার্যক্রমে সহযোগিতা পাচ্ছে। মাত্র ১০ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনো না কোনোভাবে স্কুলের সহযোগিতা পাচ্ছে। আর শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে পেরেছে ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী।

প্রযুক্তিগত সুবিধার অভাবে পড়ালেখা প্রায় বন্ধই রয়েছে চট্টগ্রাম জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা নবম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত সবুজের (১৪)। বাড়িতে টেলিভিশন থাকলেও সংসদ টিভিতে প্রচারিত পড়ালেখার ক্লাসগুলো নিয়মিত দেখার সুযোগ হয়ে ওঠেনি তার। কখনো বিদ্যুৎ থাকে না, আবার কখনো বাড়ির অন্য সদস্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে হয় টেলিভিশন।

১২ বছর বয়সী শিউলির প্রযুক্তিগত সমস্যা না থাকলেও অভিজ্ঞতা প্রায় একই। শিউলির অভিযোগ, টেলিভিশন ক্লাসে যা দেখানো হয় সেটা পরিপূর্ণ নয়। সেখানে সবকিছু বিস্তারিত দেখানো হয় না। শিক্ষকদের কাছে কোনো বিষয়ে জানতে চাওয়ারও উপায় নেই। যদিও আগে এ সমস্যা ছিল না। ক্লাসে যখন শিক্ষক সরাসরি পড়াতেন সেটা বুঝে নিতে অনেক সহজ হতো। এ কারণে লেখাপড়ার প্রতি ধীরে ধীরে আগ্রহ কমে যাচ্ছে শিউলির।

কভিড-১৯-এর প্রভাবে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে কর্মসংস্থানে। বিশ্বব্যাংকের জরিপে দেখা গেছে, বহু মানুষ স্থায়ী ও সাময়িকভাবে চাকরি হারিয়েছে। ৮৩ শতাংশ খানা (হাউজহোল্ড) জানিয়েছে, করোনায় কোনো না কোনোভাবেই তাদের আয় কমে গেছে। ৬৫ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, করোনার মধ্যে তারা পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। আর প্রয়োজনীয় খাদ্য কিনতে সক্ষম ৫৮ শতাংশ পরিবার।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, করোনাকালে পরিবারের আর্থিক সংকটে ৩৫ শতাংশ কিশোরী ও ৩১ শতাংশ কিশোর খাবার কম পেয়েছে। সব মিলিয়ে ৩৪ শতাংশ কিশোর-কিশোরী পরিবার থেকে খাবার কম পেয়েছে। কম খাবার গ্রহণের কারণে ৬২ শতাংশ কিশোর ও ৫৮ শতাংশ কিশোরী কম প্রোটিন পেয়েছে।

এদিকে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় ঘরে বসে থাকতে থাকতে মেজাজ খিটখিটে হয়ে পড়ছে অনেক শিক্ষার্থীর। ৯১ শতাংশ কিশোরী ও ৮৬ শতাংশ কিশোর এখন স্কুলে ফিরতে চায়। স্কুল বন্ধ থাকায় কিশোরীদের মধ্যে ৯৫ শতাংশ ও কিশোরদের ৯২ শতাংশ পরিবারের সঙ্গে সময় দিয়েছে। অবসরে বাসায় থেকে কিশোরীদের ১ শতাংশ ও কিশোরদের ৫ শতাংশ ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছে। মহামারীতে মোট শিক্ষার্থীর ৮০ শতাংশ কিশোরী ও ৭৬ শতাংশ কিশোর করোনার কারণে ভীত হয়ে পড়ে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিশোর-কিশোরীদের এ সংকট থেকে উত্তরণে নীতিনির্ধারকদের এমন কিছু পলিসি গ্রহণ করা প্রয়োজন, যা শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফেরাতে উৎসাহ জোগায়। বিশেষ করে মেয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফেরাতে জোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কারণ তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তাদের জন্য স্কুলে এমন কিছু সৃজনশীল প্রোগ্রামের প্রয়োজন, যেগুলো তাদের শারীরিক ও মানসিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাকিল আহম্মদ এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা ও বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা দরকার। কিশোরদের মিথস্ক্রিয়া থাকে সমবয়সীদের সঙ্গে। এখানে তারা বাধার শিকার হলে তাদের মানসিক বৃদ্ধি হয় না। মানসিক বাধার কারণে তারা ভয়ে থাকে, মেজাজ খিটখিটে থাকে।’

এ সময় কৈশোরবান্ধব হওয়ার বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এ পরিবেশটা মূলত তাদের মতো করে সৃষ্টি করতে হবে। এখন তাদের বোঝাতে চেষ্টা করতে হবে। তাদের আনন্দের বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে। অতিমাত্রায় নজরদারি না করে তাদের ভালো লাগার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের সঙ্গে নিজেদের শৈশব ও কৈশোরের গল্প বলতে হবে।’

সূত্র: বণিক বার্তা

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

 আরো পড়তে পারেন:  

A silent love confined to tears
/ জাতীয়, সব খবর
Loading...
আরো পড়তে পারেন:  স্ত্রীসহ করোনায় আক্রান্ত দাউদ ইব্রাহিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *