করোনাভাইরাস: দেশে কী করা হয়েছে, কী হয়নি

 

মানুষকে ঘরে আটকে রাখুন, লকডাউন করুন, কারফিউ জারি করুন—করোনাভাইরাস বিস্তারের ঝুঁকির মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মানুষের ব্যক্তিগত আলোচনায় এগুলো এখন বহুল উচ্চারিত শব্দে পরিণত হয়েছে। দেশে করোনাভাইরাসের রোগী ধরা পড়ার পর সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধসহ বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এ সব সিদ্ধান্ত মানুষকে ঘরে রাখার জন্য যথেষ্ট কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। যথেষ্ট সময় পাওয়ার পরও করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি কি পর্যাপ্ত ছিল? এই পরিস্থিতিতে আগামী দিনগুলোতে সরকার কি করতে চাইছে, তা জানার আগ্রহ মানুষের মধ্যে।

সরকারের সূত্রগুলো বলছে, শুরু থেকেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ুক এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে ছিল না সরকার। এ জন্যে আশপাশের দেশগুলোতে কি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেদিকে নজর রেখেছে সরকার। এ ছাড়া অর্থনীতির চাকা যাতে অচল হয়ে না পড়ে সে বিবেচনাও ছিল। এ জন্যেই ধীরে ধীরে একেকটা পর্যায় মোকাবিলার পথে হেঁটেছে তারা। তবে সরকারের এই উদ্যোগ মানুষকে পুরোপুরি আশ্বস্ত করতে পেরেছে, এমনটা মনে করছেন না অনেকেই। বিশেষ করে মহামারির প্রাদুর্ভাবের মধ্যে ঢাকাসহ তিনটি স্থানে সংসদের উপনির্বাচন অনুষ্ঠান বড় প্রশ্ন চিহ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

এবার দেখে নেওয়া যাক সরকার করোনাভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি মোকাবিলায় কি কি ব্যবস্থা নিয়েছে। এসব ব্যবস্থা আসলে বাস্তবে কতটা কাজ করেছে?

গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর দেয় সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এর পরপরই সরকার যে ব্যবস্থা নিয়েছে:
১. করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হওয়ার দিনই সরকার বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান কাটছাঁট করার সিদ্ধান্ত নেয়। তেজগাঁওয়ের প্যারেড স্কয়ারে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীসহ বিদেশি অতিথিদের আগমন বাতিল হয়। ঘোষণা দেওয়া হয়, জনসমাগম এড়াতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হবে। অবশ্য ১৭ মার্চ রাতের আতশবাজির কর্মসূচি বহাল থাকে। একই দিন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কমিটির বৈঠকে জমায়েত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।

১৭ মার্চ রাত আটটার দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, হাতিরঝিল, সংসদ ভবন এলাকা, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একযোগে আতশবাজি প্রদর্শনী হয়। এসব কর্মসূচি হাজার হাজার মানুষের জমায়েত দেখা যায়। এ ছাড়া ১৬ মার্চ রাতেই বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে কেককাটাসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলো। পরদিন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া ও ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে শত শত মানুষ সমবেত হয়। অর্থাৎ মানুষের জমায়েত বন্ধের পরামর্শ কাজে দেয়নি।

২. এভাবে জমায়েত এড়ানোর পরামর্শ কাজে না দেওয়ার সমালোচনা হয়। তবে সরকারের দায়িত্বশীলদের মধ্যে এমন একটা ভাবনা ছিল যে, করোনাভাইরাসের উৎপত্তি বাংলাদেশে নয়। বিদেশ থেকে যারা এসেছেন, তাদের হোম কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। ফলে এতে বড় কোনো ক্ষতি হবে না।

আরো পড়তে পারেন:  নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে ৮ দেশের অনুরোধের পরপরই ফের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

কিন্তু আসলেই তখন হোম কোয়ারেন্টিন কার্যকর ছিল? গত ১৫ দিনেই শুধু বিদেশ থেকে এসেছেন ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষ। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবেই, কোয়ারেন্টিনে আছে ১৭ হাজার মানুষ, যাদের অধিকাংশ বিদেশ ফেরত। তাহলে বাকি? তাদের অনেকেই হাটে, ঘাটে, মাঠে, বাজারে, শপিং মলে ঘুরে বেড়িয়েছেন। কেউ কেউ রীতিমতো ধুমধাম করে বিয়ে-শাদি করেছেন। সারা দেশে এই নিয়ে হইচই শুরু হলে প্রশাসন তৎপর হয়, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা শুরু হয়। এতে কিছুটা হলেও হুঁশ ফেরে। তবে তত দিনে দেরি হয়ে গেছে বলে আলোচনা শুরু হয় মানুষের মধ্যে।

আরেকটি আলোচনা জনমনে বেশ জোরালো, কোরোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রকৃত রোগীর সংখ্যা কি সরকার জানে? জানতে হলে তো পরীক্ষা করাতে হবে। সরকারের কাছে কি পর্যাপ্ত পরীক্ষার কিট আছে? চীনের উহানে গত ডিসেম্বরে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর প্রায় তিন মাস সময় পেয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু মার্চের মাঝামাঝি এসে জানা গেল সরকারের হাতে মাত্র দুই হাজারের মতো পরীক্ষার কীট আছে। হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ ঠেকানোর মতো সরঞ্জাম নেই। এ জন্যে হাঁচি-কাশি ও জ্বরের রোগী এলেই আতঙ্কে পালানোর পথ খুঁজছিলেন চিকিৎসক-নার্সরা। কোথাও কোথাও চিকিৎসক নার্সরা সরঞ্জামের জন্য বিক্ষোভ করছেন। মিটফোর্ড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তহবিল নেই বলে চিকিৎসক-নার্সদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ সরঞ্জাম কেনার পরামর্শ তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রীতিমতো ভাইরাল হয়েছে।

৩. করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর এর বিস্তার ঠেকাতে সব দেশই নিজেদের মতো করে ব্যবস্থা নিয়েছে, নিচ্ছে। এর মধ্যে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যবস্থাটাই সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে। চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকেই করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের শুরু। আর চীনের বাইরে দক্ষিণ কোরিয়াতেই সবার আগে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। চীন প্রথমে হুবেই প্রদেশকে পুরোপুরি লকডাউন করে ফেলে। পর্যায়ক্রমে অন্য প্রদেশগুলোতেও চলাফেরায় ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করে। এখন চীনে অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ প্রায় শূন্যের পর্যায়ে। টানা তিন দিন কোনো কোভিড-১৯ রোগী পাওয়া যায়নি।

আরো পড়তে পারেন:  সমুদ্র থেকে যেন লাফিয়ে উঠল বিশাল এক পাহাড়, ভাইরাল ভিডিও!

অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া কোনো শহর লকডাউন করেনি। তবে তারা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মানুষকে পরীক্ষা করে কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত করেছে চিকিৎসা দেওয়া শুরু করে। সন্দেহভাজনদের কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশনে নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস পরীক্ষার কীটের সংকটের কারণে বিপুল মানুষকে পরীক্ষা করার আসলেই সুযোগই ছিল না। কোনো ব্যক্তির শরীরে করোনার নিশ্চিত উপসর্গ থাকলে এবং তিনি নিজে বিদেশ ফেরত হলে বা বিদেশ ফেরত কারও সংস্পর্শে আসার প্রমাণ মিললেই আইইডিসিআর পরীক্ষা করেছে। এর ফলে করোনায় আক্রান্ত কেউ সরকারের হিসেবের বাইরে থেকে গেল কি না, সেই প্রশ্ন আছে।

করোনার রোগী ধরা পড়ার পর থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার দাবি জোরালো হয়ে উঠে। শেষ দিন পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী দাবি করে গেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি। এমনটা প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞদের মত নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে জনমতের চাপে ১৬ মার্চ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেয় সরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও এখনো গণপরিবহন চালু রয়েছে। ফলে স্বভাবতই মানুষের গ্রামমুখী যাতায়াত বেড়ে যায়। বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল আদায়ের তথ্য থেকে দেখা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে এই সেতু দিয়ে দৈনিক ১৬ হাজারের মতো যানবাহন পারাপার হয়। গত এক সপ্তাহে গড়ে ১৮ হাজারের বেশি যানবাহন পারাপার করছে। অর্থাৎ পরিবহন, অফিস-আদালত খোলা রেখে মানুষকে বাসায় থাকার আহ্বান খুব একটা কাজে দেয়নি।

এ ছাড়া সবকিছু বন্ধ করে দিলে দৈনিক আয়ে চলা এবং স্বল্প আয়ের মানুষের মুখে খাবার জুটবে কীভাবে, সেই বিষয়ে সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই। আতঙ্কের কেনাকাটায় বাজারেও আগুন লেগেছে। ফলে সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে জীবনযাত্রা চলার মতো পর্যাপ্ত প্রস্তুতিই ছিল না সরকারের।

৪. সরকার শেষ সময়ে এসে স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানানো, স্বাধীনতা পদক প্রদান অনুষ্ঠান, স্বাধীনতা দিবসের সংবর্ধনা, মন্ত্রিসভার বৈঠক, সংসদের বিশেষ অধিবেশন বন্ধ করেছে। তবে এসব কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাইরে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ সামান্যই। আজ রোববার এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করেছে সরকার। এটা অবশ্য অনুমিতই ছিল। এতে বিপুল মানুষের সংশ্লেষ আছে।

আরো পড়তে পারেন:  ৬ ফেব্রুয়ারি: ইতিহাসে আজকের এই দিনে

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যবস্থা নেওয়ার কি সময় চলে গেছে? হয়তো না। তাহলে সরকার কি ব্যবস্থা নেবে? এই বিষয়ে সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও নেতার সঙ্গে কথা বলে নানা পরিকল্পনার কথা জানা গেছে। তবে কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না। কারণ, সিদ্ধান্ত আসতে হবে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে। এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনো নীতিনির্ধারণী ঘোষণা নিজে সরাসরি দেননি। তবে সামনের দিনগুলোতে মানুষের যাতায়াত কমাতে কিছু ঘোষণা আসতে পারে বলে জানা গেছে। যেমন, মাদারীপুরের শিবচরের মতো কিছু কিছু এলাকা লকডাউন করা। আদালতের কার্যক্রম কিছুটা কমিয়ে আনা। সরকারি যে সব সেবায় মানুষের বেশি যাতায়াত হয়, সেগুলো কমিয়ে দেওয়া। দরকারি পণ্যের মূল্যে বৃদ্ধি ঠেকাতে বাজারে তদারকি জোরদার করারও চেষ্টা আছে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে লাগাম টানার জন্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের কাজে লাগানোর তৎপরতাও আছে।

আগামী দিনগুলোতে সরকারকে বেশ কয়েকটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। পর্যাপ্ত সময় পাওয়ার পরও কি যথেষ্ট প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে? মানুষকে ঘরে রাখার জন্য কি করবে সরকার? আর মানুষ ঘরে চলে গেলে তার খাবার-চিকিৎসার নিশ্চয়তা আছে? এসব প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করবে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকার কতটা সফল। অন্যথায় সরকারের মন্ত্রীরা গলা ফাটিয়ে সাফল্য দাবি করলেও মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারবে বলে মনে হয় না।

 

সূত্র: প্রথম আলো

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *