ঐতিহ্য রক্ষায় স্প্যানিশ মুসলিমদের সংগ্রাম

 

১৯৯০ সাল। ১৩ বছরের সাইরান সানচৌ পরিবারের সঙ্গে তিউনিশিয়া থেকে স্পেন ভ্রমণে গেল। নৌকা থেকে কাদিজ নামার পর একটি বিলবোর্ড তার ভেতরটা নাড়িয়ে দিল। এতে লেখা ছিল, ‘আপনাকে সানচৌজ হাউসে স্বাগত’। এটি ‘সানচৌজ হাউস’ নামক একটি হোটেলের বিলবোর্ড ছিল। সাইরান সানচৌ সেদিন আকুল হয়ে কেঁদেছিল, যেন বিলবোর্ডটি তাদের পরিবারের শত বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য ধারণ করে দাঁড়িয়েছিল।

আন্দালুস বা মুসলিম স্পেনের গোড়াপত্তন থেকে তার পতন পর্যন্ত দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে সানচৌ পরিবারের নাম জড়িয়ে আছে। ধারণা করা হয়, ইয়েমেনের মাফির গোত্রের আবদুল মালেক—যিনি তারিক বিন জিয়াদের সঙ্গে স্পেন অভিযানে এসেছিলেন, তাঁর পরবর্তী বংশধররাই সানচৌ নাম ধারণ করে। ১৪৯২ সালে মুসলিম স্পেনের পতন হলে সানচৌর মতো বহু পরিবার দেশত্যাগে বাধ্য হয়।

ভিনদেশে অস্তিত্বের লড়াই : স্পেনে মুসলিম শাসনাবসানের পর কয়েক লাখ মুসলিম মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিশিয়াসহ উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়। দেশ থেকে বিতাড়িত স্প্যানিশ মুসলিমরা ভিনদেশে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার লড়াই করে গেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। সানচৌ বলেন, ‘আমরা ছিলাম মোরিস পরিবার দ্বারা বেষ্টিত। আমার দাদা পর্যন্ত পরিবারের সবাই ছিল স্বর্ণকেশী, সাদা চামড়া ও নীল চোখের অধিকারী। কেননা জিনগত বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার জন্য তিউনিশিয়ার মুর পরিবারগুলোতে নিজ গোত্রে বিয়ের রীতি ছিল।’

১৯৯৫ সালে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবি বাহরামির পিএইচডি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি মরক্কোর রাবাতে বসবাসকারী স্পেন থেকে বিতাড়িত মুসলিমদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার সংগ্রাম সম্পর্কে বলেন, ‘তারা এখনো এমন ভাষায় কথা বলে, যাতে স্প্যানিশ শব্দমূল থেকে গৃহীত বহু শব্দ রয়েছে। সাংস্কৃতিক পার্থক্যগুলো আন্দালুসীয় পরিবারগুলোকে পৃথক করে রেখেছে। আন্দালুসিয়ান পরিচয় কখনো হারিয়ে যায়নি।’

দেয়ালে দোল খায় স্বপ্ন-চাবি : বাহরামি ৮০ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধের সঙ্গে কথা বলেন, যিনি মরক্কোর তীরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিলেন স্পেনের দিকে। বৃদ্ধের আশা, তিনি হয়তো স্বভূমিতে ফেরার কোনো লক্ষণ খুঁজে পাবেন। রাবাতের আন্দালুসীয় পরিবারগুলোর বাড়ির দেয়ালে চাবি ঝুলিয়ে রাখতে দেখা যায়। এ বিষয়ে বৃদ্ধ বলেন, এগুলো আন্দালুসে অবস্থিত তাঁদের পারিবারিক সম্পদের চাবি। একদিন তাঁরা ঘরে ফিরবেন এবং তাঁদের পুরনো দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করবেন।

আরো পড়তে পারেন:  ফরাসি প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে ওআইসির কঠোর প্রতিক্রিয়া

সানচৌ বলেন, ‘আমার স্বপ্ন, একদিন আমি পূর্বপুরুষদের ভূমিতে ফিরব এবং এক টুকরা জমি কিনব, যা আমার পূর্বপুরুষদের দুর্ভোগ ও অপমানের আগুন প্রশান্ত করবে।’

মুসলিমদের ঘরে ফিরতে বাধা : ১৬০৯ সালে আইবেরীয় দ্বীপে ‘এক বর্ণ ও এক ধর্ম নীতি’ গ্রহণ করা হয় এবং নাগরিকদের জন্য খ্রিস্ট ধর্ম বাধ্যতামূলক করা হয়। তখন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জন্য খ্রিস্ট ধর্ম, দাসত্ব বা দেশান্তরের যেকোনো একটি বেছে নিতে বলা হয়। এ সময় স্পেনের অবশিষ্ট মুসলিম ও বহু ইহুদি দেশান্তরে বাধ্য হয়। ২০১৫ সালে স্পেনের পার্লামেন্ট বিতাড়িত ইহুদিদের ঘরে ফেরার অনুমতি দেয়। কিন্তু মুসলিমদের ব্যাপারে বলে, ‘মুসলিম বাহিনী স্পেন জয়ের আগে এখানে মুসলিমদের বসবাসের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।’ তবে সমালোচকরা মনে করেন, এ আইনে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য রয়েছে। কেননা স্পেন জয়ের পর মুসলিমরা দীর্ঘ ৮০০ বছরে স্পেনীয় সমাজে একীভূত হয়ে গিয়েছিল এবং এ সময় বহুসংখ্যক আইবেরীয় আদিবাসী ইসলাম গ্রহণ করেছিল।

হাল ছাড়েনি মুসলিমরা : স্প্যানিশ মুসলিমরা আশা করে, তারা ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যার বিচার এবং নিজ দেশে ফেরার অনুমতি পাবে। স্পেনের ‘দ্য জান্তা ইসলামিকা’ (ইসলামিক বোর্ড) বহু বছর ধরে বিতাড়িত মুসলিমদের বংশধরদের চিহ্নিত করার দাবিতে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে আসছে। ২০১৫ সালে ইহুদিদের নাগরিকত্বের আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হলে মরক্কোভিত্তিক ‘ল অ্যাসোসিয়েশন পৌর লা মেমোরি দেজ আন্দালুস’ সব ধর্মানুসারীর সঙ্গে অভিন্ন আচরণের দাবি জানায়।

তথ্যঋণ : আরব নিউজে প্রকাশিত দীর্ঘ প্রতিবেদন ‘আন্দালুস রিভিজিটেড’ অবলম্বনে

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

 আরো পড়তে পারেন:  

Loading...
আরো পড়তে পারেন:  সংকটে অন্ধকার দেখছেন প্রবাসীরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *