ঐক্যফ্রন্ট, ২০ দলীয় জোটে টানাপড়েন

►জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছাড়তে পারেন কাদের সিদ্দিকী
► বিএনপির সঙ্গ ছাড়ার চিন্তা এলডিপি ও লেবার পার্টির

 

এখনই ভাঙার মতো পরিস্থিতি না হলেও বিএনপির সঙ্গে দুই জোটেরই টানাপড়েন শুরু হয়েছে চার এমপির শপথ ঘিরে। কারণ বিএনপির সংসদে যোগ দেওয়ার ঘটনা মেনে নিতে পারছে না দুই জোটের বেশির ভাগ শরিক দলই। এই ইস্যুতে করণীয় নিয়ে ভেতরে ভেতরে শলাপরামর্শ চলছে দলগুলোর মধ্যে। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ আগামীকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে যেতে পারে বলে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে ফোনে কয়েকবার চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বীরপ্রতীক কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘যা শোনা যাচ্ছে (ঐক্যফ্রন্ট ছাড়া নিয়ে) তা পরিস্থিতি পারমিট করে। তার পরও বৃহস্পতিবার দলের বর্ধিত সভায় নেতাদের মতামতের ভিত্তিতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘শুধু সংসদে যোগদানই ইস্যু নয়। দেশের জনগণের যে দাবি সে অনুযায়ী কর্মসূচি ঐক্যফ্রন্টে অনুপস্থিত।’

এদিকে আন্দালিভ রহমান পার্থর বিজেপি ২০ দলীয় জোট ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও জোটে অস্থিরতা কমেনি। বরং আরো কয়েকটি দল বিএনপির সঙ্গে থাকবে কি না তা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এলডিপির চেয়ারম্যান ড. অলি আহমেদ শিগগিরই এ বিষয়ে তাঁর দলের অবস্থান পরিষ্কার করবেন। তিনি বিদেশে আছেন। নির্বাচনের পর ২৬ জানুয়ারি দেওয়া এক বক্তব্যে অলি আহমেদ বলেছিলেন, বিএনপি সংসদে যোগ দিলে প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত হবে। এরপর ৩১ মার্চ আরেক বক্তৃতায় তিনি বলেন, ঐক্যফ্রন্টের নেতারা সরকারের সঙ্গে আঁতাত করেছেন। 

এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপির সংসদে যাওয়া নিয়ে একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তা সত্ত্বেও আমরা এখনো ২০ দলীয় জোটে আছি। তবে দলের সভাপতি দেশে  ফিরলে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।’

একাধিক সূত্রে জানা যায়, বিএনপির সংসদে যোগদান নিয়ে আপত্তি থাকলেও ২০ দলীয় জোট শরিকদের মূল আপত্তি ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে। জোটের বেশির ভাগ দলই মনে করে, ঐক্যফ্রন্টকে বিএনপি বেশি গুরুত্ব দিয়ে ২০ দলকে উপেক্ষা করেছে। দু-একটি দল ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরামের উদ্দেশ্য নিয়েও সংশয় প্রকাশ করে। তাদের মতে, সরকারের ‘বিশেষ এজেন্ডা’ নিয়ে গণফোরাম বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধেছিল এবং তারাই সংসদে যাওয়ার বিষয়ে বিএনপিকে পথ দেখিয়েছে। সে কারণে আগে ‘না’ বলেও পরে বিএনপি সংসদে গেছে।

কল্যাণ পার্টির সভাপতি মে. জে. (অব.) মুহম্মদ ইবরাহিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপির ঐক্যফ্রন্টের কাছে যাওয়াকে আমরা সমর্থন করিনি। নির্বাচন সামনে রেখে বৃহত্তর স্বার্থে মেনে নিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপির সংসদে যাওয়ার ঘটনাকেও ঐক্যফ্রন্ট বা গণফোরাম প্রভাবিত করেছে। কারণ তাদের দুজন এমপি সংসদে যোগদান করে বিএনপির পাঁচজনের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক উনকানি দিয়ে চাপে ফেলেছেন। তাই বিএনপি মনে করেছে আমরা বসে থাকব কেন?’

লেবার পার্টির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ইরান আগামী ২৩ মের মধ্যে গণফোরামকে ত্যাগ করার জন্য বিএনপিকে সময় বেঁধে দিয়েছেন। তা না হলে তাঁর দল ২০ দলীয় জোট ছাড়তে পারে। ইরান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধেছেন।’ তাঁর মতে, বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও সংসদে যাওয়ার ঘটনা সাংঘর্ষিক।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে বিএনপি গুরুত্ব দিয়েছে এবং ২০ দলীয় জোটকে উপেক্ষা করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলেই গত সোমবার ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় বিএনপির ২০ বছরের পুরনো মিত্র বিজেপি।

২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান অবশ্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ২০ দল বহুদিন ধরে একসঙ্গে আছি। তবে সব ব্যাপারে যে একমত হওয়া যাবে তা তো নয়! কিছু ব্যাপারে দ্বিমত থাকতেই পারে।’ তিনি বলেন, ‘তবে যে কারণে জোট গঠন তার প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ফলে জোট টিকে থাকবে এটি প্রত্যাশা করি। আন্দালিভ রহমান পার্থর সঙ্গে এ ব্যাপারে আমার আলোচনাও হয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, ‘এটি ঠিক যে বিশেষ পরিস্থিতিতে বিএনপি সংসদে যোগদান করায় শরিক দলগুলো কথা বলার একটি পয়েন্ট পেয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও জোট টিকে থাকবে।’

এদিকে গণফোরাম দুজন এমপিকে সংসদে পাঠিয়ে নিশ্চুপ থাকলেও ঐক্যফ্রন্টের শরিক অপর দুই দল জেএসডি এবং নাগরিক ঐক্য ওই ঘটনাকে ভালো চোখে দেখছে না। ওই দুই দলের নেতারা মনে করছেন, সংসদে যাওয়ার বিষয়ে ভেতরে ভেতরে বিএনপির সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের আঁতাত হয়ে থাকতে পারে। ফলে গণফোরাম ও বিএনপির বাইরে আলাদা কোনো জোট করা যায় কি না সে নিয়ে ভাবছেন দুটি দলের সংশ্লিষ্ট নেতারা। একটি সূত্রের দাবি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের নেতাদের সঙ্গেও ওই দুই দলের কয়েক দফা কথা হয়েছে।

জেএসডি সভাপতি আ স ম রব প্রশ্ন তুলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপির পাঁচ এমপি সংসদে গেলেই কি সংসদ বৈধ হয়ে যাবে?’ তিনি বলেন, কোটি কোটি মানুষের প্রত্যাশা সংসদে গিয়ে তাঁরা পূরণ করতে পারবে না। ঐক্যফ্রন্ট টিকে থাকবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে যাঁরা শপথ নিয়ে সংসদে গেছেন তাঁরা জনগণের আস্থা নষ্ট করেছেন।’

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সুলতান মুনসুরকে বহিষ্কার করা হলো। পরে মোকাব্বিরের বেলায় সিদ্ধান্ত ঝুলে গেল। এরপর বিএনপি সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ঐক্যফ্রন্টের রাজনৈতিক অবস্থানই কানাগলিতে চলে গেল। বিএনপিকে এই কানাগলি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে জোটের অন্যরা বেরিয়ে যাবে।’

ঐক্যফ্রন্ট এবং ২০ দল—উভয় জোটের শরিক বিভিন্ন দল মনে করে, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে হঠাৎ করে বিএনপির সংসদে যোগদানের ঘটনা সাংঘর্ষিক। অন্তত জোট শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে বিএনপির সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতারা।

বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল গত বছরের ১৩ অক্টোবর। বেশ কিছুদিন পরে ওই জোটে যোগ দেয় কাদের সিদ্দিকীর দল। গত নির্বাচনে ওই দলকে তিনটি আসনে ছাড় দিয়েছিল বিএনপি।

সূত্র: কালের কণ্ঠ

দেশের আরো প্রতি মূর্হর্তের খবর জানুন এখানে

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *