এই চোরদের লইয়া কী করিব

ইমদাদুল হক মিলন

 

বরিশালের মুলাদি এলাকার চরাঞ্চলে আমার কিছু পরিচিত মানুষ বাস করে। দিনদরিদ্র মানুষ। গত ৩০-৪০ বছরে এই মানুষগুলো ঢাকায় আমাদের বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাসায় কাজ করে গেছে। কেউ কেউ কাজ করেছে আমার বাসায়ও। সবাই মেয়ে। অল্প বয়সে কাজের জন্য ঢাকায় এসেছে। একটা পর্যায়ে নিজের এলাকায় গিয়ে বিয়েশাদি করে ঘর-সংসার শুরু করেছে। সেই মানুষগুলোকে এখনো আমরা নানা রকমভাবে যতটা সম্ভব সাহায্য-সহযোগিতা করি। করোনা শুরু হওয়ার পরও করে যাচ্ছি। ওই এলাকার মানুষের কাছ থেকে জেনেছি, সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরের চাল এক মাসের জন্য তারা যখন ৩০০ টাকায় ৩০ কেজি আনতে যায়, সেখান থেকে তাদের পাঁচ কেজি চাল কম দেওয়া হয়। এ নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে চাল দেওয়াই বন্ধ করে দেওয়া হয়। নানা রকমভাবে গরিব মানুষদের কোণঠাসা করা হয়। চারদিক থেকে এমন চাপে ফেলা হয়, এলাকায় তাদের বাস করাই অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আমাদের কালের কণ্ঠ’র একটি সামাজিক সংগঠন আছে ‘শুভসংঘ’। ১০-১১ লাখ ছেলে-মেয়ে এই সংগঠনের হয়ে সারা দেশে কাজ করে। বসুন্ধরা গ্রুপের মাননীয় চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের অনুদানে সংগঠনটি পরিচালিত হয়। আমরা বেশ কিছু ছেলে-মেয়েকে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই। দরিদ্র পরিবারকে মোটামুটিভাবে দাঁড়াবার ব্যবস্থা করি। অসহায় মানুষকে নানা রকমভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। বিপদে পড়া মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াই।

শুভসংঘের সদস্য মুন্সীগঞ্জ জেলার একটি মেয়েকে আমরা ক্লাস নাইন থেকে পড়িয়ে আসছি। সেই মেয়ে এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে পড়ছে এবং বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছে। শুভসংঘ এখনো তাকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। করোনা শুরু হওয়ার পর এই মেয়ের হতদরিদ্র পরিবার খুবই কষ্টে পড়েছে। ঈদের সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দরিদ্র মানুষের জন্য আড়াই হাজার টাকা করে অনুদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। অনেক চেষ্টা করেও এই মেয়ের পরিবার সেই অনুদানটি পায়নি। বরং তার আশপাশের কোনো কোনো সচ্ছল পরিবার পেয়েছে।

আরো পড়তে পারেন:  নেই করোনা রোগী তবুও প্রস্তুত নেপাল

আমি মাত্র দুটো ঘটনার কথা বললাম। এ রকম অজস্র ঘটনার কথা বলা যায়। এসব নিয়ে শুধু এপ্রিল মাসেই কালের কণ্ঠে আমরা কমপক্ষে সাতটি নিউজ করেছি। এক. ১০ এপ্রিল ২০২০ ‘করোনাতেও ২২৬৪ বস্তা সরকারি ত্রাণের চাল চুরি’। দুই. ১১ এপ্রিল ২০২০ ‘কালোবাজারে কেনাবেচা, ৭১৮ বস্তা চাল উদ্ধার’। তিন. ১২ এপ্রিল ২০২০ ‘চাল কালোবাজারি, দুস্থের আহাজারি’। চার. ১৩ এপ্রিল ২০২০ ‘চাল চুরি তদন্তে মন্ত্রণালয়ে কমিটি’। পাঁচ. ১৪ এপ্রিল ২০২০ ‘আ. লীগ নেতাদের হাতে ‘চালের চাবি’। ছয়. ২২ এপ্রিল ২০২০ ‘ত্রাণ কেউ পায় বারবার, কেউ পায় না একবারও’। সাত. ২৫ এপ্রিল ২০২০ ‘বরখাস্ত অব্যাহত থাকলেও থামছে না ত্রাণ আত্মসাতের ঘটনা’।

শুধু হেডিংগুলো তুলে দিলাম। ভেতরের ঘটনা পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। চোর এবং তাদের চৌর্যবৃত্তি নিয়ে লেখা প্রতিটি সংবাদ। কোথায় কোন জনপ্রতিনিধি কতটা ত্রাণের চাল চুরি করলেন, কিভাবে হজম করলেন সরকারি অনুদান, এসব নিয়ে লেখা। ত্রাণে অনিয়ম ও বিভিন্ন রকমের চুরি ও আত্মসাতের ঘটনায় ৮৭ জন জনপ্রতিনিধিকে এ পর্যন্ত বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁরা সরকারি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। চাল নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছেন। এই কীর্তিমানদের তালিকায় আছেন ২৯ জন ইউপি চেয়ারম্যান, ৫২ জন ইউপি সদস্য, একজন জেলা পরিষদ সদস্য, চারজন পৌর কাউন্সিলর ও একজন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান। ৪ জুন বৃহস্পতিবার এলজিআরডির পিআরও মাহমুদুল হাসানের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নগদ অর্থ সহায়তা কর্মসূচির তালিকা প্রণয়নে অনিয়মের অভিযোগে হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মুড়িয়াউক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম মলাই এবং হতদরিদ্রদের মাঝে ১০ টাকা কেজি দরে বিক্রির জন্য সরকারের বরাদ্দ করা চাল আত্মসাতের অভিযোগে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার রাজিউড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শফিউল ইসলাম তসকিরকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়।

আরো পড়তে পারেন:  পাঁচ কারণে নারীকে মোহরানা দিতে হয়

৬ মে ২০২০ তারিখে একটি অনলাইন পোর্টালে বলা হয়েছে, ‘২৫ জেলায় ৩৪১ টন চাল চুরির ঘটনায় ৯১ মামলা, গ্রেপ্তার শতাধিক’। অথচ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ত্রাণ বিতরণে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘এই জায়গাতে যেন কোনো রকম দুর্নীতি-অনিয়ম না হয়। মানুষের দুঃসময়ের সুযোগ নিয়ে কেউ অর্থশালী-সম্পদশালী হয়ে যাবে, সেটা কিন্তু কখনো বরদাশত করব না। আমি সতর্ক করে দিতে চাই, এ ধরনের কোনো অনিয়ম বা অভিযোগ যদি পাই, সে যেই হোক না কেন, আমি কিন্তু তাকে ছাড়ব না।’

করোনার এই দুঃসময় থেকে বেরিয়ে আসবার জন্য, দেশের মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে যত রকমের সাহায্য-সহযোগিতা সরকারের পক্ষ থেকে করা যায় তার সবই করছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। করোনার এই দুর্যোগে যেভাবে তিনি দেশ পরিচালনা করছেন, মানুষকে নিরাপদে রাখছেন, খাদ্যের অভাবে মারা যেতে দিচ্ছেন না একজন মানুষকেও, তাঁর এই কৃতিত্বের কথা লেখা হচ্ছে পৃথিবী বিখ্যাত সব সংবাদপত্রে। সেই সব সংবাদপত্র বঙ্গবন্ধুকন্যার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।  আমরা আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে গৌরব করি, অহংকার করি। কিন্তু একটা বিষয় কিছুতেই আমার মাথায় আসে না, প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারির পরও পুরোপুরি কেন থামানো যাচ্ছে না ত্রাণ আত্মসাৎ। যারা ত্রাণ চুরি চালিয়ে যাচ্ছে, সেই চোরদের নিয়ে কী করা যায়?’ আর কী করলে এই চুরি থামবে। বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, ‘এই জীবন লইয়া কী করিব?’ আমাদের বলতে হয়, ‘এই চোরদের লইয়া কী করিব?’ ‘উহাদের’ তো থামানোই যাচ্ছে না।

 

সূত্র: কালের কন্ঠ

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

 আরো পড়তে পারেন:  

Loading...
আরো পড়তে পারেন:  লকডাউনের অবসরে উদ্দাম নাচে মাতালেন সায়ন্তিকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *