আমাদেরই সবার আগে এই কিট বিশ্ববাসীর সামনে আনার সুযোগ ছিল: ড. বিজন

ড. বিজন

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. বিজন কুমার শীল। গত কিছুদিন ধরে তিনি আলোচনার কেন্দ্রে অবস্থান করছেন করোনাভাইরাস শনাক্তের ‘জি র‍্যাপিড ডট ব্লট’ কিট উদ্ভাবন করে। ড. বিজন কুমার শীলের নেতৃত্বে ড. নিহাদ আদনান, ড. মোহাম্মদ রাঈদ জমিরউদ্দিন ও ড. ফিরোজ আহমেদের গবেষণার সুফল এই কিট।

ড. বিজন ২০০৩ সালে সিঙ্গাপুরে থাকাকালীন সার্স ভাইরাসের কিট উদ্ভাবন করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ১৯৬১ সালে জন্ম নেওয়া নাটোরের কৃষক পরিবারের সন্তান ড. বিজন সামনে এসে কথা বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না। বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করে জানা যায়, তার সকাল-দুপুর-রাতের অনেকটা সময় কাটে সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ল্যাবরেটরিতে। ড. বিজন বনপাড়া সেন্ট জোসেফ স্কুল থেকে এসএসসি ও পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হয়েছিলেন ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভেটেরিনারি সায়েন্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক পাস করেছিলেন। অণুজীব বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও নিয়েছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। কমলওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে ‘শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি’ বিষয়ে পিএইচডি করেছেন যুক্তরাজ্যের দ্য ইউনিভার্সিটি অব সারে থেকে। আন্তর্জাতিক অঙ্গণে তিনি সুপরিচিত গবেষক-অণুজীব বিজ্ঞানী।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বহুল আলোচিত কিট ও করোনাকালে মানুষের করণীয়সহ আরও কিছু বিষয় নিয়ে এই প্রথম সরাসরি কথা বললেন দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে। উদ্ভাবনের এতটা সময় পরেও কিটের সুফল মানুষ না পাওয়ায়, একটা কষ্ট হয়ত ভেতরে জমে আছে। যদিও তা প্রকাশ করতে নারাজ। তাকিয়ে আছেন সামনের আলোর দিকে।

উদ্ভাবিত কিটের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইতেই ড. বিজন কুমার শীল বললেন-

করোনাভাইরাস শনাক্তের ‘জি র‍্যাপিড ডট ব্লট কিট’ নিয়ে আমাদের দিক থেকে যা করার ছিল তা আমরা সম্পন্ন করেছি। নিজেরা পরীক্ষা করে অত্যন্ত সন্তোষজনক ফল পেয়েছি। কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্যে বিএসএমইউকে ৪০০ কিট দিয়েছি। তারা ট্রায়াল শুরু করেছে। ধারণা করছি তারা ভালো রেজাল্ট পাচ্ছে।

শুরু থেকেই আপনারা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী যে, আপনাদের উদ্ভাবিত কিট প্রায় শতভাগ সফল। এতটা আত্মবিশ্বাসের কারণ কী?

আমরা অ্যান্টিবডি এবং অ্যান্টিজেন দুটি পরীক্ষার কিট উদ্ভাবন করেছি। এই দুটি পরীক্ষা যদি সম্পন্ন করা যায়, তবে প্রায় সব রেজাল্ট সঠিক পাওয়া যায়। শতভাগ হয়ত বলা যায় না। সামান্য এদিক সেদিক হতে পারে। যদিও আমরা প্রায় শতভাগ সাফল্য পেয়েছি। যে কথা ডা. জাফরুল্লাহ স্যার বারবার বলেছেন। ডায়াগনস্টিকের দুটি উইন্ডো থাকে। একটি ভাইরাল উইন্ডো, অন্যটি হোস্ট উইন্ডো। হোস্ট মানে মানব শরীর। কোনো ব্যক্তি যখন ভাইরাসের আক্রমণের শিকার হন, তখন তার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টিকারী যে অঙ্গগুলো থাকে তারা একটি বায়োমার্কার তৈরি করে। এই বায়োমার্কার শরীর থেকে ভাইরাস দূর করে। আমাদের কিট দিয়ে অ্যান্টিবডি এবং অ্যান্টিজেন অর্থাৎ দুটি উইন্ডোই পরীক্ষা করা যাবে। আমরা যদি শুধু অ্যান্টিবডি বা শুধু অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করতাম তাহলে সব ভাইরাস শনাক্ত করতে পারতাম না। যেহেতু আমরা দুটি পরীক্ষাই করতে পারছি, সেহেতু আমাদের সাফল্যের হার অনেক বেশি।

একটি উদাহরণ দিয়ে বললে হয়ত বুঝতে সুবিধা হবে। গত রোববার একটি ডাক্তার পরিবার আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। বাবা-মা-ছেলে তিনজনই ডাক্তার। ছেলে গত ১০ মে হাসপাতাল থেকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। ১২ মে পিসিআর পরীক্ষায় তার কোভিড-১৯ পজিটিভ এসেছে। তার বাবা-মাও পজিটিভ। তাদের নমুনা আমাদের কিট দিয়ে পরীক্ষা করে দেখলাম ছেলের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। বাবার অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে সামান্য, যা শনাক্ত করা যায় না বললেই চলে। কিন্তু তার অ্যান্টিজেন তৈরি হয়েছে। মায়ের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি, অ্যান্টিজেন তৈরি হয়েছে। এই তিনজনের ক্ষেত্রে আমরা যদি শুধু অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করতাম, তবে শনাক্ত হতো একজন। যদি শুধু অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করা হতো, তাহলে শনাক্ত হতেন দুইজন। যেহেতু আমরা অ্যান্টিবডি ও অ্যান্টিজেন দুটিই পরীক্ষা করতে পেরেছি বলে তিনজনকেই শনাক্ত করতে পেরেছি। এটাই হচ্ছে আমাদের উদ্ভাবিত গণস্বাস্থ্যের কিটের বিশেষত্ব। সে কারণেই শতভাগ সাফল্যের প্রসঙ্গ আসছে।

আমরা করোনাভাইরাস শনাক্তের পূর্ণাঙ্গ একটি কিট মানে মাত্র তিন থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে শনাক্তের একটি পদ্ধতি দেশকে, বিশ্ববাসীকে দিতে যাচ্ছি। এটা হচ্ছে আমাদের আনন্দ।

আরো পড়তে পারেন:  ২২ জানুয়ারি: টিভিতে আজ রয়েছে যেসব খেলা

কিন্তু দেশের মানুষ বা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছাতে কি একটু দেরি হয়ে যাচ্ছে?

করোনাভাইরাস শনাক্তের কিট উদ্ভাবনের ঘোষণা আমরা প্রথম দিয়েছি। আমেরিকা, ইউরোপ আমাদের অনুসরণ করেছে। সেনেগালসহ আরও অনেক দেশ আমাদের পরে শুরু করে কিট তৈরি করে ফেলেছে। তবে সেনেগালেরটা শুধু অ্যান্টিবডি, অ্যান্টিজেন না। আমাদের মতো অ্যান্টিবডি এবং অ্যান্টিজেন শুধু আমেরিকার একটি কোম্পানি তৈরি করেছে। গত সপ্তাহে তাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আমরা সবার আগে উদ্ভাবন করলেও, বাজারে আনতে পারিনি। অন্যরা বাজারে নিয়ে এসেছে।

শুরু থেকে আপনাদের উদ্ভাবিত কিট নিয়ে বারবার লিখেছি। সে কারণে হয়ত গত দুই-তিন দিনে বেশ কয়েকজন প্রশ্ন করেছেন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কিটের কী হলো?

ধন্যবাদ যে আমাদের উদ্ভাবন নিয়ে ইতিবাচকভাবে বারবার লিখেছেন। বাজারে আসতে দেরি হওয়াই হয়ত এই প্রশ্নের কারণ। বেশ দেরি হয়ে গেল। আমাদেরই সবার আগে এই কিট বিশ্ববাসীর সামনে আনার সুযোগ ছিল, সম্ভাবনা ছিল। যাই হোক, এখন বিএসএমএমইউতে কিটের ট্রায়াল চলছে। ধারণা করছি, অল্প সময়ের মধ্যে তারা রিপোর্ট দিতে পারবে। তাদের হয়ত একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয়। সময় লাগে।

প্রথমে ২০০ অ্যান্টিবডি এবং পরে ২০০ অ্যান্টিজেন কিট দিয়েছি। আরও ৬০০ কিট প্রস্তুত করে রেখেছি তাদের দেওয়ার জন্যে।আশা করছি ঈদের ছুটির মধ্যে তারা কিট পরীক্ষা অব্যাহত রাখবেন। বিএসএমইউতে জায়গা-সংরক্ষণের স্বল্পতা আছে। সে কারণে সব কিট একবারে দিতে পারছি না। অল্প অল্প করে দিচ্ছি। আশা করছি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে হয়ত তারা রিপোর্ট দিয়ে দিবে। বিএসএমইউ’র ট্রায়ালেও ভালো রেজাল্টই আসছে বলে ধারণা করছি। কারণ সার্স ভাইরাসের কিট উদ্ভাবনের অভিজ্ঞতা-জ্ঞান এ ক্ষেত্রে কাজে লেগেছে।

সার্স ভাইরাসের কিট উদ্ভাবনের সেই অভিজ্ঞতা কি একটু বলবেন?

আমি ২০০৩ সালে সিঙ্গাপুর সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলাম। সে বছর ফেব্রুয়ারি মাসে সার্স ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। তখন সিঙ্গাপুর সরকার সার্স ভাইরাস শনাক্তকরণ, ক্যারেকটারাইজেশন এবং ডায়াগনস্টিক টেস্ট কিট ডেভেলপমেন্টের দায়িত্ব দিয়েছিল আমাদের ল্যাবকে। আমরা ল্যাবে সার্স ভাইরাস তৈরি করি। লক্ষ্য করি ভাইরাসটি অতি দ্রুত তৈরি হয়। ১২ ঘণ্টার মধ্যে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি ভাইরাস তৈরি হয়। আমরা বিস্মিত হয়ে পড়ি, একটি ভাইরাস এত দ্রুত কীভাবে বৃদ্ধি পায়! বুঝতে পারি আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের ভেতরে কীভাবে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ক্ষতি করছে সার্স ভাইরাস। সিঙ্গাপুর সরকারকে আমরা ভাইরাসটির ভয়াবহতার রিপোর্ট দেই।

গবেষণা চলতে থাকে। ভাইরাস শনাক্তকরণের কিট উদ্ভাবন করি। সার্স ভাইরাসের সঙ্গে করোনাভাইরাসের খুব একটা পার্থক্য নেই।

এখন যে পিসিআর টেস্ট হচ্ছে সেটা তখন আমরা সিঙ্গাপুরে ডেভেলপ করেছিলাম। সর্বশেষে উদ্ভাবন করেছিলাম ডট ব্লট কিট, যেটা এখন গণস্বাস্থ্যের ল্যাবে করছি। ডট ব্লট কিটে খুব দ্রুত মাত্র ১৫ মিনিটে রেজাল্ট পাওয়া যেত। যেটা আমার নামে পেটেন্ট করা। ডট ব্লট পদ্ধতিতে এখন রেজাল্ট পাওয়া যাবে তিন থেকে পাঁচ মিনিটে।

অন্য পদ্ধতির পরীক্ষায় রেজাল্ট পেতে দুই-তিন ঘণ্টা সময় লাগত। সিঙ্গাপুরে যত মানুষ সার্সে আক্রান্ত হয়েছিল তাদের সবাইকে আমরা পরীক্ষা করেছিলাম।

২০০৩ সালের ৩১ মে পৃথিবী থেকে সার্স ভাইরাস দূর করা হয়েছিল। তারপর এটা নিয়ে আর কাজ করিনি।

আপনার গণস্বাস্থ্যে যোগ দেওয়া ও করোনাভাইরাস শনাক্তের কিট উদ্ভাবনের প্রক্রিয়াটা নিয়ে জানতে চাই।

সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে এসেছি। গণবিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছি এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। তখন চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে তখন এটা নিয়ে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়নি। আমি তখন ডাক্তার জাফরুল্লাহ স্যারকে বললাম, আমার এই ভাইরাস নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। এটা একটা ভয়াবহ ভাইরাস। এই ভাইরাস শনাক্তের কিট বিষয়ে আমি জানি। সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা তাকে জানালাম। তিনি আমাদের করোনাভাইরাস নিয়ে কাজ করতে বললেন। আমরা গবেষণা শুরু করলাম ফেব্রুয়ারি মাসে।

সার্স ভাইরাসের সঙ্গে করোনাভাইরাসের আসলে মিল কতটা?

মূলত একই ভাইরাস। সার্স ভাইরাসের সঙ্গে করোনাভাইরাসের মিল প্রায় ৮২ শতাংশ। সার্স ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা গিয়েছিল, করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধ করা যায়নি। সার্সের বিস্তার রোধ করা না গেলে তখনও এখনকার মতো অবস্থা হতো।

আরো পড়তে পারেন:  ৩ ফেব্রুয়ারি: ইতিহাসে আজকের এই দিনে

কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসে করোনাভাইরাস নিয়ে তো তেমন আতঙ্ক দেখা দেয়নি। এমন ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, আপনি কি তা বুঝতে পেরেছিলেন?

চীনে যে সময় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ চলছিল, সেই সময়টা ছিল ভাইরাস বিস্তারের জন্যে অত্যন্ত উপযোগী। চীনা নববর্ষের কথা বলছি। এটা মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়। চীনা নববর্ষে কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ কোটি চাইনিজ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায়। এভাবে করোনাভাইরাস সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে বলে আমি ধারণা করছিলাম। এটা ভয়ঙ্কর রূপ নিতে যাচ্ছে তাও অনুধাবন করছিলাম। কারণ পৃথিবীর এমন কেনো দেশ নেই যেখানে চীনারা কাজ করেন না। ২০০৩ সালের পৃথিবীতে মানুষের এতটা যাতায়াত ছিল না। বাজেট এয়ারলাইন্স পৃথিবীতে মানুষের যাতায়াত বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমি আবার সিঙ্গাপুরে যাই এবং ফিরে আসি ১৭ ফেব্রুয়ারি। ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল করোনাভাইরাসের উপর একটি মিটিংয়ের আয়োজন করে। সেই মিটিংয়ে যোগ দেই। সেখানে বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারক পর্যায়ের ডাক্তার, বিশেষজ্ঞদের প্রায় সবাই উপস্থিত ছিলেন। সেই মিটিংয়ে বলেছিলাম, করোনাভাইরাসকে যদি আমরা ছোট করে দেখি তবে ভুল করব। এটা কিন্তু ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়বে। আপনারা এখনই একটি ইমারজেন্সি প্লান নেন, যাতে প্রতিরোধ করা যায়।

আসলে হয়েছে কি, খোদ আমেরিকা বা ইউরোপও বুঝতে পারেনি ভাইরাসটি এত দ্রুত ছড়াতে পারে। সবাই হয়ত ধারণা করেছিল ২০০৩ সালের সার্স ভাইরাসের মতো, এটারও হয়ত বিস্তার ঠেকানো যাবে। আমার সিঙ্গাপুরে কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় ভয়াবহতার বিষয়টি বুঝতে পারছিলাম। সতর্কও করেছিলাম। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ল্যাবে কিট উদ্ভাবনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলাম।

তারপর পৃথিবী লকডাউনে চলে গেল। অনেক বন্ধু-শুভাকাঙ্ক্ষীদের থেকে সহায়তা পেয়েছি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সহায়তা পেয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাতেই আমাদের কিটের কার্যকারিতা পরীক্ষার কাজটি এগিয়েছে।

কিন্তু তারপরও এত দেরি হয়ে যাচ্ছে কেন?

অনেক বিষয় আছে। এখন আর সেসব নিয়ে কথা বলতে চাই না। বিএসএমইউ কিট পরীক্ষা করছে। আমরা গবেষণা অব্যাহত রেখেছি। প্রতিদিন কিছু কিছু উন্নতি করছি। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কিটের অ্যাপ্রুভাল পেয়ে যাওয়ার আশা করছি। আর পেয়ে গেলে এটা শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা পৃথিবীর মানুষের কাজে লাগবে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্যে এমন একটি কিট অত্যন্ত জরুরি। অনেক মানুষ সম্ভবত আক্রান্ত হয়ে গেছে। পরীক্ষার অভাবে তাদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না। সেখানে আমাদের কিট দিয়ে তিন থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে শনাক্ত করা যাবে।

বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা হয়ত অনেক। কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক বিচারে সরকারি, বেসরকারি হিসেব মিলিয়েও তো অনেক কম। এর কারণ কী?

এ ক্ষেত্রে আশার দিকটি হলো, বাংলাদেশে যারা আক্রান্ত হচ্ছে তাদের অধিকাংশেরই শরীরে ভাইরাসের ক্ষতির দিকটি খুব দুর্বল।

যে ডাক্তার পরিবারের কথা বললাম তারাও খারাপভাবে আক্রান্ত হননি। অর্থাৎ জীবনের ঝুঁকি নেই বললেই চলে। শনাক্তের দুর্বলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে রোগীর সংখ্যা কম। কত মানুষ যে আক্রান্ত হয়েছে, আবার সুস্থ হয়ে গেছে-তা হয়ত তারা নিজেরাও জানেন না। তাদের থেকে হয়ত অনেক মানুষের মাঝে ছড়িয়েছে। এ কারণেই শনাক্ত করা খুব জরুরি।

যারা আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন, তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গেছে। দুই চার বছরের মধ্যে তার আর আক্রান্তের সম্ভাবনা নেই।

কিন্তু চীন বা দক্ষিণ কোরিয়ায় দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় দফায় আবার সংক্রমণ হচ্ছে।

একটি জায়গায় হয়ত ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকানো গেছে। কিন্তু অন্য আরও বহু জায়গায় তো রয়ে গেছে। আপনি দেয়াল তৈরি করে পানি ঠেকাতে পারবেন। আবার কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায় পানি আসতেও পারে। আক্রান্ত কেউ হয়ত সেসব জায়গায় যাচ্ছে। সবার তো আর উপসর্গ থাকে না। তাদের থেকে অন্যরা সংক্রমিত হচ্ছে।

আপনাদের কিট দিয়ে পরীক্ষা হবে কোথায়? এর জন্য কি ল্যাব দরকার হবে, না যেকোনো জায়গায় পরীক্ষা করা যাবে?

এটা নিয়ে আমরা ভাবছি। আমাদের কিট দিয়ে পরীক্ষা করা অত্যন্ত সহজ। দেখিয়ে দিলে যে কেউ তা করতে পারবে। এর জন্য ল্যাব জরুরি না। যেকোনো জায়গায় পরীক্ষা করা যাবে। কিন্তু এর একটি ঝুঁকির দিক আছে। যদি খুব সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা না হয়, তবে যারা পরীক্ষা করবেন তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। সে কারণে ভাবছি, অ্যাপ্রুভাল পেয়ে গেলে প্রথমাবস্থায় আমরা ল্যাবেই পরীক্ষা করব। যত্রতত্র পরীক্ষার দিকে শুরুতেই যেতে চাচ্ছি না। পর্যায়ক্রমে আমরা যত্রতত্র পরীক্ষা করব। সেভাবেই পরিকল্পনা করছি।

আরো পড়তে পারেন:  শতভাগ কার্যকর ওষুধ আবিষ্কারের দাবি

ল্যাবেই যদি পরীক্ষা করা হয়, তবে কি গণহারে পরীক্ষা করা সম্ভব?

হ্যাঁ, সম্ভব। পিসিআরে একটি পরীক্ষার রেজাল্ট পেতে দুই দিন লেগে যাচ্ছে। একটি ল্যাবে যদি ৫০০ স্যাম্পল আসে, পরীক্ষা করতে হয়ত ১০ দিন লাগছে। সেখানে আমাদের কিট গিয়ে একদিনেই ৫০০ পরীক্ষা করে রেজাল্ট পেয়ে যাবেন। একটি ল্যাবে একদিনে কয়েক হাজার পরীক্ষা করা যাবে। একটি পরীক্ষায় সময় লাগবে মাত্র তিন থেকে পাঁচ মিনিট।

এক্ষেত্রে আরেকটি কথা বলে রাখা দরকার, পরীক্ষায় শনাক্ত করা গেল কিনা তা অনেকটা নির্ভর করে, কে কখন পরীক্ষার জন্যে যাচ্ছেন তার উপর। একজনের হয়ত সামান্য কাশি হলো, প্রথম দিনই তিনি পরীক্ষার জন্যে গেলেন। আরেকজন হয়ত কাশির সাত দিন পরে গেলেন। প্রথম দিন যিনি গেলেন পিসিআরে তার রেজাল্ট সঠিক আসবে। সাত দিনের দিন যিনি গেলেন, পিসিআরে তার রেজাল্ট সঠিক নাও আসতে পারে। আমাদের কিটের টেস্টে দুইজনের রেজাল্টই সঠিক আসবে। প্রথম দিনের জনের অ্যান্টিজেন ও সাত দিনের জনের অ্যান্টিবডি টেস্ট সঠিক আসবে।

ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমের কারণে গবেষক-বিজ্ঞানী হিসেবে আপনার একটি পরিচিতি তৈরি হয়েছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণকালে দেশের মানুষের উদ্দেশে কিছু বলবেন? মানুষ কী করবে বা কী করা উচিত?

করোনাভাইরাস সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। আমাদের সবাইকে এর মুখোমুখি হতে হবে। আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া মানেই মারা যাওয়া। এখন পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশে যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হচ্ছে, তার ক্ষতিকর দিকটি বেশ দুর্বল। আক্রান্তের পর আপনি যদি আতঙ্কিত হয়ে নার্ভাস না হন, ভাইরাস আপনার তেমন ক্ষতি করতে পারবে না।

যদি একটু খারাপ লাগতে থাকে, জ্বরজ্বর বা অল্প কাশি অনুভূত হয়, তবে দিনে তিন চারবার হালকা রং চায়ে গোলমরিচ, লং দিয়ে খাবেন এবং তারা দিয়ে তিন চারবার গার্গল করবেন। এতে ভাইরাস ফুসফুসে ঢোকা ঠেকানো যাবে। আর ভিটামিন-সি’র কোনো বিকল্প নেই। এখন বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষের সকালে ২৫০ রাতে ২৫০ মোট ৫০০ এমজি ভিটামিন সি খাওয়া দরকার। করোনাভাইরাস প্রতিরোধের জন্য এটা অত্যন্ত জরুরি। ভিটামিন সি’র দাম বেশি না। আমলকিসহ এ জাতীয় যা এখন পাওয়া যায়, সেগুলো খেতে হবে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র একটি ভিটামিন সি জিঙ্ক তৈরি করছে। এটা খুবই ভালো। জিঙ্ক ট্যাবলেটও এ ক্ষেত্রে উপকারী।

সব মানুষের আরেকটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে মনে রাখা দরকার, থুথু যেখানে সেখানে ফেলা যাবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনও কেন থুথু বিষয়ে বলছে না, বুঝতে পারছি না। হাঁচি বা কাশির চেয়ে থুথু অনেক বেশি বিপদের কারণ হতে পারে। থুথু শুকিয়ে ডাস্টে পরিণত হয়ে ভাইরাস অনেক দিন টিকে থাকতে পারে। থুথু বা কফ থেকে পানির মাধ্যমে ভয়াবহভাবে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে সবার সতর্ক হওয়া দরকার। কোনো আক্রান্ত রোগীর প্রস্রাব বা পায়খানা যদি পানির লাইনে সংমিশ্রণ ঘটে যায়, সেটাও হতে পারে বড় বিপদের কারণ।

সাবান দিয়ে বারবার হাত ধুতে হবে। আর সাধারণ সবজি-ফল পরিষ্কার পানি দিয়ে দুইবার ধুয়ে নিলেই চলবে।

সতর্ক থাকতে হবে। কোনো কিছু নিয়েই আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। আতঙ্কিত হলে মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।

 

সূত্র: DailyStar

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *