আওয়ামী লীগের সাবেক এমপিরা কোণঠাসা

দলীয় অনুষ্ঠানেও ডাক পড়ে না

একটা সময় ছিল যখন দিনভর তাদের পাশে শত শত নেতাকর্মীর ভিড় লেগে থাকত। ব্যস্ততা ফুরাতে চাইত না। সভা-সমাবেশ বা অনুষ্ঠানে যোগদানের আমন্ত্রণেরও অভাব ছিল না। নিজেদের নির্বাচনী এলাকাজুড়েও থাকত তাদের নিজে বড় বড় বিলবোর্ড। থাকত ব্যানার-ফেস্টুন। স্থানীয় রাজনীতিতে তাদের ক্ষমতার দাপট ছিল। কিন্তু এ সব চিত্র পাল্টে গেছে।

সংসদ সদস্য পদ চলে যাওয়ার পরপরই সব পাল্টে গেছে। আওয়ামী লীগ দলীয় অনেক সংসদ সদস্য সাবেক হওয়ার পর দুঃসহ সময় পার করছেন। আগের মতো দলীয় অনুষ্ঠানে তাদের আর ডাক পড়ে না। স্থানীয় রাজনীতিতে তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এমন অবমূল্যায়নের অভিযোগ তুলে সাবেক এক এমপির আত্মহত্যার হুমকি দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর অঞ্চলের একমাত্র নৌকার বিজয়ী প্রার্থী আমজাদ হোসেন তালুকদারের বেঁচে থাকা এখন কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক সময়ের দাপুটে আওয়ামী লীগ নেতা আমজাদ হোসেন এখন হতাশায় দিন পার করছেন। শুক্রবার রাতে কুড়িগ্রামের উলিপুরের নিজ বাসভবনে সংবাদ সম্মেলনে আক্ষেপের কথা শুনিয়ে তিনি আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় এ অঞ্চলের সংগঠক ছিলাম। মুজিবনগর সরকারের পলিটিক্যাল সুপারভাইজার ছিলাম। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিনিয়ত অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য আমজাদ হোসেন ২৭ বছর উলিপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে হতাশার কথা প্রকাশ করা সম্পর্কে জানতে চাইলে আমজাদ হোসেন রোববার যুগান্তরকে বলেন, এ সংবাদ প্রকাশের পর স্থানীয় নেতাদের অনেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তিনি বলেন, সবার চাওয়া দলে যেন ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়। একইসঙ্গে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা সম্মেলন করে যোগ্যদের দ্রুত নেতৃত্বে নিয়ে আসা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

আরো পড়তে পারেন:  ঈদের পর চালু হচ্ছে গণপরিবহন!

দলীয় রাজনীতিতে শুধু আমজাদ হোসেন তালুকদারই নন, এমন আরও অনেককে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। এমন উদাহরণ প্রায় সারা দেশেই রয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলে এক সময়ের দাপুটে অনেক নেতা ও এমপি এখন হতাশায় দিন পার করছেন। সদ্য সাবেক হওয়া এমপি ও দলীয় নেতাদের অভিযোগ- বর্তমান এমপিরা একতরফাভাবে সবকিছু করার চেষ্টা করছেন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ রোববার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে বলেন, সাবেক এমপি ও নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা উচিত বলে আমিও মনে করি। কিন্তু এটাও সত্য ‘সময় ও নদীর স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না।’ আমাদের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। নতুনরা আমাদের আর পাত্তা দিচ্ছে না- এটা আমিও টের পাচ্ছি। তবে এতে কোনো ক্ষোভ নেই।

জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আগের ৪৫ জন এমপি দলীয় মনোনয়ন পাননি। তারা এখন সবাই সাবেক এমপি। এছাড়া ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভার ৩১ জনই নতুন। পুরনো মন্ত্রিসভার ৩৬ জন বাদ পড়েছেন। সংরক্ষিত মহিলা আসনে ৪২ জনের ৪০ জনই বাদ পড়েছেন। এর আগের জাতীয় সংসদের অনেক সদস্য বাদ পড়েছেন। তাদের জায়গায় এসেছেন নতুন মুখ।

দলীয় সূত্রমতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলীয় মনোনয়ন ঘিরে তৃণমূল থেকে অভিযোগের পাহাড় পড়ে। শুধু তাই নয়, অনেক স্থানে এমপিদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। এরপর কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের দলীয় মনোনয়নের বাহিরে রাখা হয়। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তারা একাদশ নির্বাচনে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করেন। তবে নির্বাচনের পর বর্তমান এমপিদের মনোভাব পাল্টে গেছে। বিশেষ করে সাবেক এমপি ও তাদের অনুসারী নেতাকর্মীদের ওপর তারা ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন। তাদের নিষ্ক্রিয় করে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সাবেক এমপি যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তারা সক্রিয় অংশ নিয়েছেন। অথচ এখন তাদের কোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেয়া হয় না। এলাকায়ও তাদের কোণঠাসা করে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আরো পড়তে পারেন:  যে চার আমলে নারীর জান্নাতের ৮ দরজা খোলা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা এবং সাবেক এমপিদের সক্রিয় রাখার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত অনেককে গণভবনে ডেকে সান্ত্বনাও দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সম্প্রতি দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক করে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, এখন সুসময়। তবে দুঃসময় আসবে না, এটা কখনও ভাববেন না। কেউ কারও থাকবে না। আজকে নিজের মনে করে একজনকে নেতা বানাচ্ছেন। আপনার যখন খারাপ সময় আসবে তখন আপনাকে সালামও দেবে না। কাজেই এমন নেতা বানিয়ে লাভ নেই।

এর আগে চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ইউসুফের অসুস্থতার খবর আলোচনায় এসেছিল। শেষ বয়সে এসে অর্থাভাবে দীর্ঘদিন তিনি চিকিৎসা বঞ্চিত ছিলেন। ২০১৮ সালের জানুয়ারির শুরুতে তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে তিনি মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফকে উন্নত চিকিৎসা দেয়ার নির্দেশ দেন। প্রথমে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

 

সূত্র: যুগান্তর

এই পোস্টটি যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেইসবুক পেজটি লাইক দিন এবং এই রকম আরো খবরের এলার্ট পেতে থাকুন

 আরো পড়তে পারেন:  

Loading...
আরো পড়তে পারেন:  ‘বাবা কোলে নাও’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *